সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কাগজ


টিনের মরিচাধরা ভাঙা দরজা হড় হড় শব্দে খুলে গেল।ঠেলে প্রবেশ করলেন এক মহিলা।ঢুকবার সময় ভাঙা টিন লেগে শাড়ির আঁচল চিরে গেল।পৃথিবীর তপ্ত গৃষ্মে বসন্ত রোগীর মতো দগদগে গর্তেভরা চোখমুখ ঝলসে কালো হয়ে গেছে।খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করলেন- "বাপো!" "পকুরডার মাছ কি হামি পামুনা?"

কি রে আছিয়া নাকি?আঁয় বস।
পাবিনা ক্যান!

আছিয়া বারান্দায় মাটির উপরই উবু হয়ে বসে।হাত দুখানা সামনে হাঁটুর উপর  রাখে - তাহলে পকুরের দখল নিমু এখন।

নে গিয়া।

হামাক নাকি পকুরে নামবারই দিবেনা?

কে বললো?

তামানে কচ্চে,হামার নাকি কোনো অধিকার নাই।একটা মেটে রং কাগজের ভাঁজ খুলে সামনে বাড়িয়ে বললেন- এই তো হামার কাগজ,দেখো দিনি।হামার নামেই তো কাগজ করা আছে।

কাগজটা হাতে নিয়ে লোকটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণের পর বললেন- এ কাগজের কোনো মূল্য নাই। আমার দেওয়া স্বাক্ষর টাই আছে শুধু;আর কারও স্বাক্ষর নাই।জমি তো আমার না,আমি স্বাক্ষী।

কাগজের নির্দিষ্ট জাইগাগুলো নির্দেশ করে বললেন ----জমিদাতা--১-২-৩-৪ -৫ সব ফাঁকা।স্বাক্ষীর স্বাক্ষর ১ নাম্বারে আমি।বাঁকী ২-৩ ফাঁকা।

মহিলাটির সাথে তার ছোট ছেলে এসেছিল,তার পরনে লুঙ্গী;গা খালি, গোঁফের দাগ দেখা দিয়েছে কেবল।সে ই মায়ের অভিভাবক।লোকটিকে বলল- নানাজান,কাগজডা আর একবার ভাল করে দ্যাকেন দেকি।

অনুরোধে কি কাজ হয়?কাগজে যা লেখা তাই তো হবে নাকি?
ভরা মজলিসে এ কাগজ দেখালে আমি ফল্টে পড়মু।সবায় অস্বীকার গেলে আমার করার কি থাকপে?শুধু আমার স্বাক্ষর আছে।কাগজে সকল দাতার স্বাক্ষর,স্বাক্ষীর স্বাক্ষর তোর মা সেই বছর ৩ আগেই নেয়নি কেন বল দেখি?

ছেলেকে উত্তর দেবার সুযোগ না দিয়ে মহিলাটি বলল- কাগজ কি হামার কাছে আচলো?ওই আফজাল হারামজাদা,হামার সুয়ামি;সে ই থুচলো।তালাকের পর দিছে।

ও আচ্ছা।পুকুর নেওয়ার সময় তাক বলিস নি কেন স্বাক্ষরগুলা সবার নিয়া নিতে?

আমি কি এতো বুজি?মামু তুমি কাগজডা আরেকবার ভাল করে দেখো তালেই বুজতে পারবেন,সব আচে।

লোকটির মেজাজ একটু বিগড়ে যায়।বলে-- না বুঝলে কি করি ক-তো?এ কাগজ দিয়া তুই কিচ্ছু করতে পারবু না;কেস ও হবেনা।সামান্য এ কাগজের জোরে থানায় কেস নিবেনা।

মহিলা চিৎকার দিয়ে ওঠে-- হারামি হামার সব ধ্বংস করে দিল।হামি কতো কষ্ট করে পকুরডা নিচি।কতো কষ্টের ট্যাকা।কতো না খায়া থাকিচি।সে পুকুরের মাছ খাওয়া হামার ভাগ্যে নাই।

তোক কি তালাক দিছে?

হু,তুমরা জানেন না?তালাক না নিলে হামাক মাইরা ফেলবে।কাইটা ফেলবে।হামার বাপের বাড়িত যায়া শাশায়া আসে।ঘর বাড়ি চুরমার করে সেইখানে যায়া।

দেশ এতো অরাজক?তোর বাপের বাড়ি সে যায় কিভাবে?বাপের কাছে পাওয়া জমি কি তার নামে লেখে দিছিস নাকি?

ভেউ ভেউ কাঁদতে কাঁদতে সম্মতি দেয়- হুঁ.....

সারিচে!মানুষ এতো বোকা হয়?

না দিলে মাইরা ফেলবে,ল্যাংগট করবে সবার সামনে,কি করমু?
দিয়া দিচি।এতো জিনিস হামার তাক দিচি,এইটুক দিবার পারমু না?
পকুরডাত শুধু হামার দখল দিয়া দেও।তুমি মাস্টার মানুষ,তুমার কতা দশটা মানষে শুনে।মামু হয়া কাজডা করে দিবার পারবেন না?

কথা তো সেটা না।কিন্তু ;কোন শক্তি বলে আমি যাই?এ কাগজের তো শক্তি নাই।
এ কাগজটা লেখা শুধু এ স্বাক্ষর কয়ডার জন্যেই।আইনগত একটা ডকুমেন্ট এটা।এটাই বল।

মহিলা এবার ক্ষেপে যায়।আক্ষেপ, রাগ,অভিমান মিশ্রিত স্বরে বলে ওঠে-- এ সামান্য কামডা করবার পারবেন না?হামার পক্ষে ভরা মজলিসে বুলব্যার পারবেন না?
দেখি, কাগজটা দেখি বলে হাত থেকে  নিয়ে ছিঁড়ে কয়েক টুকরো করে ফেলে।
এ সামান্য পকুরডা তো?হামার কতো সম্পদ আফজাল খাচে।হামার সব দিছি।হামার দুইডা ছাওয়াল।তাদের আকীকা পর্যন্ত বজ্জাতটা দেয়নি।হামি লিজে দুইডা বড় বড় খাসি পাইলা নাম থুচি।ছাওয়াল দুইডাক মানুষ করিচি।আর এ বয়সে আইসা হামাক অথৈ সাগরত ভাসায়া দিল।
ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে- তুই হামার ছাওয়াল।তুর কাছে হামার জোর অনুরোধ; তুই যদি কোনোদিন টাকা পয়সা আয় করিস,তুর বাপোক তা থ্যাকা দিবার পারিস;কিন্তু হামার যা সম্পদ মরার পর রাখে যামু,তার একটা কানাকড়িও যেন তুর বাপ না পায়।
মাস্টার মশাইয়ের কাছে মাফ চায় মহিলাটি।মামা, হামার ভুল হয়্যা গেছে;তুমাক হামার জন্যে কিচ্ছু করা লাগবেনা,ভাল থাকো।যার কেউ নাই তার আল্লাহ্ আছে।
কথা শেষ করে মহিলাটি হন হন চলে গেল।যাবার সময় টিনের দরজা ঝনাৎ করে বন্ধ হয়।মাস্টার মশায় কাগজটা ছেঁড়ার আকস্মিকতা ভুলতে পারেনা ।বলতে চেয়েছিল- এ কাগজে তো হামার স্বাক্ষর ছিলই রে বাবা,হামি তো বিচারের মজলিস ডাকলে ভরা মজলিসে তোর পক্ষেই কমু।
ভাঙা টিনের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছিলো আছিয়া বিলাপ করতে করতে উঠানের খেজুর গাছ পার হয়ে চলে গেছে।এরপর আর কোনোদিন আসেনি।

ধরণ: ছোটগল্প
লেখা: নসিমুজ্জামান নীরব।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট (নমুনা)

জনাব মোঃ আশরাফ উদ্দিন, রেক্টর বিপিএটিসি (সরকারের সচিব) , এঁর বিদায় অনুষ্ঠান, তারিখঃ ৩০-মে-২০২৪ ইং, সময়ঃ ১১.০০ ঘটিকা। বিদায় অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্রমধারা   ১) পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত  ২) কর্মচারী ক্লাব এর সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য ৩ ) কর্মচারী ক্লাব এর সভাপতির বক্তব্য ৪ ) জনাব রাজীব কুমার ঢালী, সহকারী পরিচালক এর বক্তব্য ৫) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৬) জনাব শামীম হোসেন, উপপরিচালক এর বক্তব্য ৭) জনাব হাসান মূর্তাজা মাসুম, পরিচালক এর বক্তব্য ৮) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৯) আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের পক্ষ হতে উপ-পরিচালক, আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রাজশাহী এর বক্তব্য ১০) লেডিস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদিকা এর বক্তব্য ১১) জনাব মোঃ আশরাফুজ্জামান, প্রকল্প পরিচালক এর বক্তব্য ১২)  জনাব মোঃ শাহীনূর রহমান, এমডিএস এর বক্তব্য ১৩) জনাব  মোঃ মনিরুল ইসলাম, এমডিএস এর বক্তব্য ১৪) জনাব মোঃ জাকির হোসেন, এমডিএস এর বক্তব্য ১৫) বিদায়ী রেক্টর মহোদয়কে ফুল এবং বিদায়ী উপহার প্রদান  ...

সুবহানাল্লাহঃ পেন্সিল_আর্ট

 

বৈপরীত্য

হয়তো তার মৃত্যুর কথা মনে পড়ে; কারণ, বারেক আলী আবার সেই স্বপ্নটা দেখে,বারবার দেখে;যে স্বপ্নে লম্বা লেজওয়ালা একপাল বুনো কুকুর বা শেয়াল ধস্তাধস্তি করে ছিঁড়ে খায় তার ঝুলে পড়া চামড়ার কোঁচকানো শরীর।সময়ের বিবর্তনে শুকিয়ে আসা চামড়াবহুল শিকার হয়তো তাদের কাছে বিস্বাদ লাগে,ফলে চিবানোর পর গিলতে না পেরে বা দাঁতে না কাটায় ক্ষোভে বিরক্তিতে থুতুর মতো ছুঁড়ে দেয় আকাশের দিকে।কয়েক হাত দূরে গিয়ে সে থ্যাবড়ানো টুকরাগুলো ধূলার সাথে পলট দিয়ে দলা পাকায়।সারল মাংশ না পেয়ে তাদের হিংস্রতা চরমে ওঠে।ভগ্ন-নিথর ও অসহায় দেহটা টানাহেঁচড়া না করে সমর্পিত করে ক্ষুধার্ত হাড্ডিসার মুখগুলোর সামনে। বারেক আলী এ স্বপ্নটা শেষ হলে প্রতিদিনের মতো ভয় পায়,বুকে থুতু ছিঁটিয়ে বিড়বিড় করে---জলপানির ওয়াক্তে দ্যাকা স্বপন ছ্যাঁচা হয়!শব্দকটা শেষ হলে কেমন হাঁপিয়ে ওঠে, দাঁতহীন চোওয়ালের ফাঁক গলে ঘোগলা গড়াতে থাকে;সিথানের নোংরা ত্যানা দিয়ে তা মুছে, এবং নিজেকে চিমটি কেটে জীবিত না মৃত পরখ করার ইচ্ছা জাগে,কিন্তু করেনা;শনের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভোরের অরুণ রাঙা সূর্যের দিকে চেয়ে থাকে নির্লিপ্তভাবে। তবে আজ সে একটি স্বপ্ন বেশি দেখে,যা দেখার পরই সিদ্ধান্...