গঙ্গা-যমুনা-ব্রক্ষপুত্র বিধৌত এই উপমহাদেশ নানা জাতী,
বর্ণ, ভাষা এবং সংস্কৃতির এক অদ্ভুত সম্মিলন ছিলো। আর্য,
মৌর্য, সেন, পাল,
রাজপুত, চৌহান, তুর্কি,পাঠান-মোঘলরা পালাক্রমে এই দেশ শসন করলেও কখনো
সাম্প্রদায়িক বিভেদের তিক্ত দেয়াল তৈরী করে নি। এখনো এদেশে তারা শুধুমাত্র শোষন
অতঃপর ভীনদেশে সম্পদ পাচার এই মনোভাব নিয়ে উপমহাদেশে আসে নি,
বরং প্রত্যেকেই এদেশেই তাদের ভিটে গড়েছিলো। কিন্তু একমাত্র
বৃটিশরাই এসেছিলো সম্রাজ্যবাদের সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে। এদেশে তারা এসেছিলো ক্ষমতা
দখল করে উপনিবেশ সৃষ্টি করে, সম্পদ লুন্ঠন করে স্বদেশে পাঠাতে। প্রায় দুইশত বছর ধরে
বৃটিশরা শোষণ চালিয়ে যায়। নানা ধর্ম-বর্ণের বৈচিত্র্যে রাঙ্গা এই উপমহাদেশকে সহজে
শাসন ও শোষণ লক্ষ্যে তারা নানা ধর্ম ও গোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার সংকীর্ণতা
এবং বিভেদের দেয়াল তৈরী করে। সেই দীর্ঘ শোষণ ছায়া ফেলে দেশ ভাগের করুণ বিচ্ছেদে।
সাম্প্রদায়িক বিষ পাম্পে দেশে তীব্র হিন্দু-মুসলমান বৈরীতা সৃষ্টি হয়। যুগ যুগ ধরে
হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি শান্ত-সুন্দর প্রতিবেশে অবস্থান করলেও তাতে ফাটল ধরে।
প্রতিবেশী একে অপরের সেই দীর্ঘকালের সৌহার্দ্য ভুলে যায়,
পরিনত হয় শত্রুতে। বৃটিশদের সাথে সাথে এই সকল সাম্প্রদায়িক
বিভেদে ইন্দন দেয় তথাকথিত ক্ষমতার মোহে উম্মাদ কতিপয় রাজনীতিবিদ ও দুরদর্শিতাহীন
উগ্র সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় নেতারা। কংগ্রেস অসাম্প্রদায়িক মাসনে তৈরী হলেও এক
শ্রেণীর হীন রাজনীতিবিদগণের দ্বারা সাম্প্রদায়িক রং লাগে;
মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা হয় এবং উভয় দলে ধর্মভিত্তিক উগ্র
জাতীয়তাবাদ প্রবল হয়। তারি সাথে দুই শত বছর ধরে তিলে তিলে তৈরী সাম্প্রদায়িক
বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা এবার ভয়ংকর আকার ধারণ করে। ফলে, একসময় হিন্দু-মুসলমান সবাই চায় সম্রাজ্যবাদী বৃটিশ
বেনিয়াদের হাত হতে দেশ মুক্ত হোক, তবে দেশটাও ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমারেখায় ভাগ হোক।
সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণপূর্বক যদি সম-ধর্মীয় সমাজ ও সংস্কৃতি তৈরীতে
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়তো উত্তম কিছুই বয়ে আনতে
পারতো,
কিন্তু দেশভাগকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পেতে
থাকলে তা দেশ ও সমাজকে কলুষিত করে। নেতারা বৃটিশমুক্ত ভারতে সংখ্যালঘুসহ সকল
নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ করে দেশভাগের কথা মুখে আনলেও নানা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ
সৃষ্টি করে তার হতে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ও ক্ষমতাপ্রাপ্তিকে বড় করে দেখে। ফলে
হিন্দু সংখ্যাগুরু অঞ্চলে উগ্র হিন্দু নেতার এবং মুসলমান সংখ্যগুরু অঞ্চলে উগ্র
মুসলিম নেতারা নানা উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান ও কর্মসূচী প্রদান করতে থাকে;
কলকাতা কেন্দ্রীক কিছু পত্র-পত্রিকাও এতে শামিল হয়। একে একে
নানা স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হতে থাকে ।
দ্যা গ্রেট কলকাতা রায়ট খ্যাত “প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস “(১৬ আগস্ট ১৯৪৬) দেশভাগপূর্ব
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার একটি ঘৃণ্যতম উদাহরণ। ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬
তারিখ সকাল থেকেই কলকাতার লালবাজার হতে শুরু হওয়া এই দাঙ্গা একে একে রাজাবাজার,
কলাবাগান, কলেজ স্ট্রিট, হ্যারিসন রোড (বর্তমানে মহাত্মা গান্ধী রোড),
কলুটোলা, বড়বাজারসহ সমগ্র কলকাতায় দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিলো। কলকাতা
পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শকের তথ্য অনুযায়ী ৫,০০,০০০ জন উক্ত দাঙ্গায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়ে ছিলো এবং দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার অনুমান ৭,৫০০ জন থেকে ১০,০০০ জন ব্যাক্তি প্রাণ হারিয়েছিলো।
কলকাতার দাঙ্গা পরবর্তীতে নোয়াখালী,
পাঞ্জাবসহ নানা স্থানের দাঙ্গায় অণুঘটক হিসেবে কাজ করে এবং সাম্প্রদায়িক তিক্ততা
বাড়িয়ে দেয়। এতে, হিন্দু সংখ্যাগুরু অঞ্চলে মুসলিমরা এবং মুসলমান সংখ্যাগুরু
অঞ্চলে মুসলিমরা নিজের অনিরাপদ বোধ করতে লাগলেন। দেশভাগের জিগির আরো তুঙ্গে উঠলো,
রাজনীতিতে উদারপন্থী এবং মধ্যপন্থীদের হার হলো,
বাধ্য হয়ে তারাও শামিল হলেন দেশভাগের বয়ানে। তবে,
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাসেম, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী প্রমুখ সর্বশেষ চেষ্টা করলেন,
পাঞ্জাব এবং উত্তর প্রদেশ ভাগ হলেও যেন বৃহত্তর বাংলা অখন্ড
থাকে,
তারা অখন্ড বাংলার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু বল্লব ভাই প্যাটেল, নেহরু এবং খাঁজা নাজিমুদ্দিনদের টেবিলে তা টিকলো না। উপমহাদেশে ধীরে ধীরে দেশভাগের দিকেই
হাটলো। ভয় এবং নিরাপত্তা শংকায় মুসলিমরা লাহোর,
পিন্ডি এবং ঢাকায় এবং হিন্দুরা কলকাতা,
উত্তর প্রদেশ এবং হিন্দুপ্রবণ এলাকাগুলোতে স্থানান্তরিত হতে
লাগলেন। দেশভাগের এবং হিজরতের বয়ানে লোকজন নিজ ভিটে বাস্তু স্বল্প দামে এবং অনেক
ক্ষেত্রে মূল্যহীনভাবে পরিত্যাক্ত রেখেই পরভূমে পাড়ি জমালেন। পেচনে রেখে গেলেন
তাদের জন্মভিটা, পূর্বপুরুষদের
স্মৃতি এবং সহায় সম্বল। অনেক ক্ষেত্রেই পাশের বাড়ির যে প্রতিবেশী দীর্ঘকাল তার
দুঃখ-সুখের ভাগিদার ছিলেন, যে নেতা তাদের বৃটিশমুক্ত
স্বাধীন দেশের নানা সম্ভাবনার গল্প শোনাতেন;
তারাই পরিত্যাক্ত সম্পত্তির লোভে তাদের ভয় দেখিয়ে
বাস্তচ্যূত করতে লাগলেন। সবচেয়ে বড় ভুলটি করলেন তৎকালীন তথাকথিত জাতীয় নেতারা। দেশভাগ পরবর্তী স্বাধীন দেশে
হিন্দুপ্রদান অঞ্চলে মুসলমানদের এবং মুসলমানপ্রধান অঞ্চলে হিন্দুদের নিরাপত্তার
বলয় সৃষ্টি বা প্রতিশ্রুতি প্রদানে ব্যার্থ হলেন।
অবশেষে দেশভাগ হলো, হিন্দু-মুসলিম স্বাধীনতার উল্লাসে ফেটে পড়লো, তবে ইতিহাসের করুণ প্রহসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হলো সে সব দুঃখী
লোকগুলো,
যারা আপন ভিটেমাটি বির্সজন দিয়ে ভীনদেশে হিজরতের জন্য
ভাগ্যখাতায় নাম লেখালেন। Partition of India:
The Human Dimension গ্রন্থের লেখক ইয়ান ট্যালবট এর মতে, ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় পাঞ্জাব জুড়ে মোট প্রায় ১.২
কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটে; প্রায় ৬৫ লক্ষ মুসলমান পূর্ব পাঞ্জাব থেকে পশ্চিম পাঞ্জাবে
এবং ৪৭ লক্ষ হিন্দু ও শিখ পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে পূর্ব পাঞ্জাবে স্থানান্তরিত হয়। পাঞ্জাবে
সংগঠিত দাঙ্গায় সর্বোচ্চ প্রায় ২০,০০,০০০ হিন্দু-মুসলিম নিহত হয় এবং করাচির ব্রিটিশ হাইকমিশনার এর মতে শুধু পাঞ্জাব
অঞ্চলে ৮,০০,০০০ মুসলিম নিহত হয়। কার্যত কোনও মুসলিম পূর্ব পাঞ্জাবে বেঁচে ছিলেন না এবং
কার্যত কোনও হিন্দু বা শিখ পশ্চিম পাঞ্জাবে বেঁচে ছিলেন না। দেশভাগের নির্দয় আঁচড়
লেগেছিলো বৃহত্তর বাংলায়; বাঙালি হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ এবং বাঙালি
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলার মধ্যে বঙ্গভঙ্গের পরে,
উভয় পক্ষ থেকে বাঙালি হিন্দু / বাঙালি মুসলিম শরণার্থীদের স্থানান্তর
ঘটে। বাংলা ভাগের ফলে ভারত থেকে প্রায় বিশ লাখ মুসলমান তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে
আসেন। অন্যদিকে, পূর্ববঙ্গ
থেকে ৫৮ লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ভারতে দেশান্তরী হয়। অপরদিকে, গুজরাট হতে অনুমানিক ৩,৪০,০০০ জন মুসলমান পাকিস্তানে পাড়ি জমান; আগত শরণার্থীদের সংখ্যা বেশ বড় ছিল, ১০ লাখেরও বেশি হিন্দু শরণার্থী (মূলত সিন্ধি ও গুজরাটি) গুজরাটে চলে এসেছিল।
দেশভাগ পরবর্তীতে পরিত্যক্ত ভূমি বন্টনও সুষ্ঠু হয় নি,
বরং নেতা এবং তাদের অনুসারীরা তা দখলে নিলেন।ফলে,
দেশভাগের পর নয়া ভারত, নয়া পাকিস্তানের স্রোতে বাস্তু হারানো লোকগুলো জীবন-জীবিকা
সবই খুইলেন। ইতিহাস তাঁদের নিয়ে নির্দয় প্রহসন খেলোলো,
লক্ষ-কোটি জনতা সেই প্রহসনের বলি হলেন। বাংলা ভাগের ৭০তম
বার্ষিকীতে গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের প্রামাণ্যচিত্র 'সীমান্তরেখা' দেশভাগের এক গভীর বেদনার আখ্যান মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাসের
অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন নতুন করে। দেশভাগ নিয়ে আরো অনেক সিনেমা, বিস্তর ইতিহাসের বই
লিখিত হয়। চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল এর চিত্রা নদীর পাড়ে, অনিল শর্মা কর্তৃক পরিচালিত আধুনা “গাদারঃ এক প্রেম কথা”; খুশবন্ত
সিং এর ‘’ট্রেন টু পাকিস্তান’’ ইত্যাদি বই দেশভাগের নির্মমতার সাক্ষ্য দেয়। শতাব্দী প্রায়
পেরতে চললো, দেশভাগের হতভাগারা চাপা পড়লেন ইতিহাসের পেচনের পৃষ্ঠায়;
কেউ তাঁদের কথা আর মনে রাখে নি; ইতিহাসও এই মানব বিপর্যয়
হতে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তাই, যুগে যুগে নতুন প্যালেস্টাইন সমস্যা, দারফুর সংকট
বার বার জিইয়ে থাকে বিশ্ব-মোড়লদের ক্ষমতার লোভ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে।
লেখাঃ মোহাম্মদ বাহা উদ্দিন
গবেষণা কর্মকর্তা, বিপিএটিসি।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন