সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একালে আমাদের ঈদ!



বছর কয়েক আগের কথাই বলছি। তখন ঈদ মানে সত্যিকারের আনন্দ উৎসব ছিলো। আমরা চট্টগ্রামে থাকতাম, মামারা টঙ্গীতে।  নানাবাড়িতে নানা-নানু আর দাদা বাড়িতে দাদু বেঁচে ছিলেন। ফলে তাদের টানে ঈদ উপলক্ষে সবাই বাড়িতে ফিরতো। দাদাবাড়ি-নানাবাড়ি দু'বাড়িতেই উৎসব আর অনাবিল আনন্দ বিরাজ করতো। আমার দুইকুলের গোষ্ঠীই বেশ বড়সড়। এছাড়াও গ্রামগুলোতে ঈদ উপলক্ষে সবাই আসতেন। সাধারনত আমাদের চাঁদপুরের লোকেরা শহরমুখী, ঈদ ছাড়া অন্য সময়ে গ্রামে গেলে কারো ছায়াটুকুও খুঁজে পাওয়া যায় না। আর ঈদ উপলক্ষে সবাই বাড়ি ফের নাড়ির টানে; বাবা-মা আত্মীয়দের সাথে ঈদ করতে। ফলে ঈদে পুরো গ্রামজুড়েই উৎসব ভাব বজায় থাকে। ছেলেবেলার আকুতি তুলে ধরলে অতিরঞ্জন হবে না, আমরা বছরজুড়েই মুখিয়ে থাকতাম, ঈদ কবে আসবে, কবে বাড়ি যাবো! ঈদে সাতকুলের সবাই বাড়ি আসতো। বাড়ি গেলেই পুকুরে দল বেঁধে সাঁতরে বেড়ানো, চরে- সুপারী বাগানে ছেলেবেলার বন্দুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, স্কুল মাঠে ভোর সকালে গোল্লাছুট খেলা, বিকেল করে নদীর ঘাটে যাওয়া আরো কতো অনাচার কর্ম! ঈদপূর্ব রাত্রে উঠোনে পাটি বিছিয়ে কাজিন সবাইকে নিয়ে উন্মুক্ত ট্যালেন্ট হান্ট আয়োজন, "যে কি পারো বলো দেকি!" ঈদের দিনে সেলামী,ঈদ কার্ড ড্রয়িং, গ্রাম্য মেলা আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো। আহা কি সোনঝরা স্মৃতি।
নানা বেঁচে থাকতে প্রতি ঈদেই বাড়ি যাওয়া আবশ্যক ছিলো। তারপর, নানা মারা গেলেন; ছেলেবেলার মধুর ঈদ থেমে গেলো। নানু টঙ্গীতে থিতু হলেন। ঈদে সবাই আসে না। আমারাও অনিয়মিত হয়ে পড়লাম। দুয়েক ঈদে আসি, না চট্টগ্রামেই ঈদ করি। মেহফিল আর জমে না, হারানো সুর বাজে না, শূন্যতায় ভরে গেলো প্রশান্তির প্রহরগুলো।
ভার্সিটিতে উঠার সুবাদে ঢাকা পাড়ি জমালাম। এরপর প্রতি ঈদেই প্রায় নানুর সাথে বাড়ি যাই, বাবা-মা চট্টগ্রাম থেকে আসেন, মামারাও। রঙমহলের জির্ণ রঙ নতুন প্রলেপ পেলো, হারনো সুর পেলো নতুন রাগ। তারপর একে একে দিন-সুদিন পেরিয়ে অসময়ের ঘটঘটা চলে এলো। মাস্টার্স শেষ, আমি আত্মপরিচয় সংকটে পড়ে গেলাম। নতুন করে নীড় খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত আমি ছন্নছাড়া। গাছে গাছে ভগ্ন ঢালে নীড় গড়ার চেষ্টা অবিরত! মন মেলে না কিছুতেই। ঈদগুলো নিরবে কেটে গেলেই বাঁচি।
 সান্ধ্য পারিয়ে আঁধার ঘোরতর হলো। এই আঁধার অমবস্যার আঁধার নয়, দুঃসময়ের আঁধার। করোনাকাল আগ-পরেই নানু-দাদু এবং একমাত্র খালু মারা গেলেন। বুক চিড়ে তখন শুধু শোকের শীতল নিঃশ্বাস। ঈদ উৎসবের সুদিন ডুবে গেলো অতীতের ঘোলা জলে।

এবারের কথাই বলছি। সঙ্গত কোন কারনে হলে ঈদ করার সিদ্ধান্ত   নিলাম। অফিস ছুটি হতেই ব্যাগ নিয়ে হলে চলে এলাম। কিন্তু যে জন্য হলে এলাম তা আর হলো বই কি। রিডিং রুম পুরোটা ফাঁকা, বইয়ে মন বসছে না কোন ভাবেই। মাকে ফোন দিয়ে জানলাম মা আর ছোটবোন চট্টগ্রামে থাকবে। বাবা বাড়ি গিয়েছেন ছোটভাইকে নিয়ে, মায়াকাতুরে এই লোকটা কখনো বাড়ির মায়া ছাড়তে পারে না। বাদ বাকি সবাই টঙ্গীতে, ছোট মামা বাড়ি চলে গেছেন। আমি আর কি করি! হাপিত্যেশ করে বেড়াই। একবার ভাবি ঈদের দিন টঙ্গীতে যাবো, আবার ঈদ কি ছাই! হলে একঘুম দিলে বিকেল পেরিয়ে যাবে, ঈদটাও কেটে যাবো, আমাদের একালে সুখ-উৎসব সবই কেমন যেন বড্ড আপেক্ষিক! সকাল বেলাও মনকে শক্ত করে বেঁধে নিলাম। বাড়ি যাবো না। কিন্তু বেলা বাড়তেই শপথের বাঁধন অল্পতেই আলগা হয়ে গেলো। কেন যেন বাড়ি ঢাকছে আমায়। কিছু অস্ফুট স্বর বারবার ঢেকে বলছে "একবার এসে আমাদের দেখে যাও! কতোদিন তোমার মুখ দেখি নি!"

আমি অনাদিকালের যাযাবর। তল্পিতল্পা  সবর্দা গোছানো থাকে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। অস্ফুট সেই স্বরগুলোর ঢাকে সাড়া দিতে.....


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট (নমুনা)

জনাব মোঃ আশরাফ উদ্দিন, রেক্টর বিপিএটিসি (সরকারের সচিব) , এঁর বিদায় অনুষ্ঠান, তারিখঃ ৩০-মে-২০২৪ ইং, সময়ঃ ১১.০০ ঘটিকা। বিদায় অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্রমধারা   ১) পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত  ২) কর্মচারী ক্লাব এর সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য ৩ ) কর্মচারী ক্লাব এর সভাপতির বক্তব্য ৪ ) জনাব রাজীব কুমার ঢালী, সহকারী পরিচালক এর বক্তব্য ৫) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৬) জনাব শামীম হোসেন, উপপরিচালক এর বক্তব্য ৭) জনাব হাসান মূর্তাজা মাসুম, পরিচালক এর বক্তব্য ৮) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৯) আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের পক্ষ হতে উপ-পরিচালক, আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রাজশাহী এর বক্তব্য ১০) লেডিস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদিকা এর বক্তব্য ১১) জনাব মোঃ আশরাফুজ্জামান, প্রকল্প পরিচালক এর বক্তব্য ১২)  জনাব মোঃ শাহীনূর রহমান, এমডিএস এর বক্তব্য ১৩) জনাব  মোঃ মনিরুল ইসলাম, এমডিএস এর বক্তব্য ১৪) জনাব মোঃ জাকির হোসেন, এমডিএস এর বক্তব্য ১৫) বিদায়ী রেক্টর মহোদয়কে ফুল এবং বিদায়ী উপহার প্রদান  ...

সুবহানাল্লাহঃ পেন্সিল_আর্ট

 

বৈপরীত্য

হয়তো তার মৃত্যুর কথা মনে পড়ে; কারণ, বারেক আলী আবার সেই স্বপ্নটা দেখে,বারবার দেখে;যে স্বপ্নে লম্বা লেজওয়ালা একপাল বুনো কুকুর বা শেয়াল ধস্তাধস্তি করে ছিঁড়ে খায় তার ঝুলে পড়া চামড়ার কোঁচকানো শরীর।সময়ের বিবর্তনে শুকিয়ে আসা চামড়াবহুল শিকার হয়তো তাদের কাছে বিস্বাদ লাগে,ফলে চিবানোর পর গিলতে না পেরে বা দাঁতে না কাটায় ক্ষোভে বিরক্তিতে থুতুর মতো ছুঁড়ে দেয় আকাশের দিকে।কয়েক হাত দূরে গিয়ে সে থ্যাবড়ানো টুকরাগুলো ধূলার সাথে পলট দিয়ে দলা পাকায়।সারল মাংশ না পেয়ে তাদের হিংস্রতা চরমে ওঠে।ভগ্ন-নিথর ও অসহায় দেহটা টানাহেঁচড়া না করে সমর্পিত করে ক্ষুধার্ত হাড্ডিসার মুখগুলোর সামনে। বারেক আলী এ স্বপ্নটা শেষ হলে প্রতিদিনের মতো ভয় পায়,বুকে থুতু ছিঁটিয়ে বিড়বিড় করে---জলপানির ওয়াক্তে দ্যাকা স্বপন ছ্যাঁচা হয়!শব্দকটা শেষ হলে কেমন হাঁপিয়ে ওঠে, দাঁতহীন চোওয়ালের ফাঁক গলে ঘোগলা গড়াতে থাকে;সিথানের নোংরা ত্যানা দিয়ে তা মুছে, এবং নিজেকে চিমটি কেটে জীবিত না মৃত পরখ করার ইচ্ছা জাগে,কিন্তু করেনা;শনের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভোরের অরুণ রাঙা সূর্যের দিকে চেয়ে থাকে নির্লিপ্তভাবে। তবে আজ সে একটি স্বপ্ন বেশি দেখে,যা দেখার পরই সিদ্ধান্...