বিসিএস রিটেন পড়ছি; কিন্তু কি ছাইপাস পড়ছি তা ঠাহর না পেলেও গা গিটগিট করে উঠলে টের পাই চা পানের সময় হয়ে গিয়েছে। এক দুপুরে চা পানের জন্য জিয়া হলে গেলাম। সেখানে হালিমের সাথে দেখা। হালিম প্রতিষ্ঠানের ছোটভাই; দেখাও হলো অনেক দিন পর, তাই সহসাই অতীত-বর্তমান আবর্তের গল্প জমে উঠলো। হালিম হঠাৎ বলে উঠলো "ভাই! রায়হানের রিলেশনটা তো পাক্কা হয়ে গেলো শেষে"।
"কোন রায়হান?" প্রশ্ন তুলে পরিচিত বেশ কয়েকটা রায়হানের মধ্যে তাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করলাম।
"ভুলে গেলেন? হালিশহরের রায়হান। বছর দুয়েক আগে ঈদের দিনে আপনি, শফিক আর রায়হান মিলে একট আপুর বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন ফতেয়াবাদ। রায়হান তো আপনার কথা খুব বলে"
গল্পের প্রজ্ঞান বলে দিতেই বাকিটুকুর পাঠোদ্ধার করতে আর দেরী হলো না।
বছর দুয়েক আগের ঈদুল ফিতরের কথা। বাসায় সিদ্ধান্ত হলো এই ঈদে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর যাচ্ছি না, চট্টগ্রামেই করছি। সাথে আমার সিদ্ধান্তটাও পাকা করলাম "ঈদের দুই দিন লম্বা ঘুম দিচ্ছি, কারন আত্মীয়-কুটুম কেউ কোথাও নেই এই শহরে।" ঈদের দিন নামাযের পর অর্ধ- যুগের সহপাঠী শফিক ফোন দিয়ে জানালো বিকেলে বাসায় আসছে এক বন্ধুসহ। বন্ধুর আসার খবরে খুব পুলকিত হলাম সাথে আপ্যায়ন নিয়ে শংকিত হলাম, কারন মা অসুস্থ! রান্না-বান্নায় হাত লাগাতে পারছেন না আর আমি রান্না-বান্নায় বিশেষভাবেই অজ্ঞ, তদুপরি যা পারলাম আয়োজন করলাম। দুপুর কিছুটা গড়িয়ে এলে শফিক বন্ধুসহ বাসায় এলো। খাবার পাতে নতুন বন্ধুর সাথে পরিচিত হলাম, রায়হান! হাফেজ, পলিটেকনিক্যাল থেকে সিভিলে ডিপ্লমা নিয়েছে এখন আবার IIUC থেকে ল' ডিগ্রী নিচ্ছে, খুব মিশুক প্রকৃতির। কথার ফাকে জানালো কাছেই তার ফুফুর বাড়ি। পারিবারিক কারনে প্রায় এক যুগ হলো ফুফুর বাসায় যায় নি এছাড়াও তার এক সহপাঠিনীর বাসা আছে। মেয়েটির নাম পিয়া, দেখতে অনিন্দ্য সুন্দরী। মেয়েটির প্রতি তার বিশেষ অনুরক্তি আছে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে প্রস্তাব দিলাম "চল! তাদের বাসায় ঈদের দাওয়াত খেয়ে আসি।" প্রস্তাবটা মজার ছলেই দিয়েছিলাম, রায়হান আমাকে অবাক করে দিয়ে দ্রুত রাজি হয়ে গেলো। মেয়েটাকে ফেসবুকে নক করে ঈদের দাওয়াতটা নিয়ে নিলো। কিন্তু বিপত্তি বাঝলো অন্যখানে, মেয়েদের বাসা ফতেয়াবাদ, হাটহাজারী! ওটা আহমদ শফী সাহেবদের প্রভাবিত এলাকা, সেখানকার লোকজন অতি মাত্রায় রক্ষণশীল, চাটগাঁইয়া ভাষায় "ওয়াইব্বা এলাকা"। এছাড়া মেয়েটি রায়হানের ক্লাসমেট হলেও কখনো তার সাথে ফেইস-টু-ফেইস কথা হয়নি, এমনকি মেয়েটির চেহারা পর্যন্ত দেখেনি (কারন IIUC এর মেয়ের হিজাব পড়ে ক্লাসে আসে)। শফিক মুখের উপর না করে দিলো "ওয়াইব্বে এলাকা! বিনা দাওয়াতে একটা মেয়ের বাসায় যেতে চাচ্ছি, মূখ্যত মেয়েটিকে দেখতে যচ্ছি। এমন ঈদের দিনে দাওয়াতের বদলে মার কপালে জুটার সমূহ সম্ভাবনা!!" তখন আমি ক্যাম্পাস থার্ড ইয়ার! ভেতরে একরত্তি সাহস না থাকলেও আগলা ভাবটা যথেষ্ট পরিমানে সঞ্চিত! তাই জবাবটা বাগাড়ম্বরভাবে দিলাম "কে কি বলে দেখে নিলো" চার-পাঁচজন রাজনৈতিক বড়ভাইয়ের মুখাস্ত নাম বলে দিলাম। রায়হান সাহসী হয়ে বললো "চলো যাই"। আমি খুশিতে সিটি মারতে লাগলাম, কারন ভেতরে তখন ভারত-পাকিস্তান ফাইনাল খেলার মতো তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
তিনজনে প্রথমে রায়হানের ফুফুর বাসায় গেলাম। অনেক বছর পর ভাইপোকে কাছে পেয়ে ফুফু আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেন; খুব আপ্যায়ন করলেন। এবার ফতেয়াবাদের দিকে চললাম। ফতেয়াবাদ বাজারে নেই দেখি শফিকের পা আর চললে না ভয়ে, সাহস দিলাম। বললো " দাড়া! আসরের নামাযটা পড়ে নিই।" তারপর দোয়া-দরুদ পড়ে শফিক বুকে ফুঁ মেরে নিলো।
মেয়েটি তার বাসার এড্রেস দিয়ে ছিলো ফোনে আর জানিয়েছিলো তার ছোট দুই ভাই বাসার সামনে থাকবে আমাদেরকে রিসিভ করতে। আমরা জিজ্ঞেস করতে করতে সামনে এগুচ্ছি আর রায়হান এড্রেস ক্লারিফাই করে নিচ্ছে। বাতলে দেয়া ঠিকানার কাছাকাছি আসছেই আমরা তার ছোট ভাইদের খুঁজতে লাগলাম, তবে দেখা পাচ্ছিলাম না। এমন সময় দেখলাম পাশের পাঁচতলা থেকে এক নারীমুখ আমাদের হাত নাড়ছেন। এটিই তাদের বাসা ভেবে আমরা পাঁচতলায় উঠলাম। বাসায় নক জানতে পারলাম এই এড্রেসে পিয়া নামের কেউ থাকে না! একদৌড়ে নিচে নেমে এলাম। শফিক বেচারার ভয়ে ত্রাহি অবস্থা, আমিও নিদারুণ ভয় পেয়ে গেলাম। "না জানি অতি রক্ষণশীল এই এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ক্যালমার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি"- এই ভয়ে। রায়হান পিয়াকে ফোন দিলো, পিয়া জানালো আর দুটো বিল্ডিং পরেই তাদের বিল্ডিং। সামনে একটু হাঁটতেই দেখি দুটো ছেলে দাড়িয়ে আছে, তারা এগিয়ে এসে অভর্থ্যনা জানালো, পিয়াও বারান্দা থেকে হাত নেড়ে উপস্থিতি জানান দিলো।
অজানা শংকা নিয়েই পিয়াদের বাসায় প্রবেশ করলাম আমরা। কিন্তু ভেতরটা আমাদেরকে প্রচন্ড অবাক করে দিলো। পিয়া রীতিমতো যেন বিয়েবাড়ির আয়োজন করে ছেড়েছে। হরেক রকম পিঠে, জুস, মিস্টান্ন, ফালুদা আরো কতো কি! পিয়াদের একান্নবর্তী পরিবার, জ্যাঠা-দাদী-কাকীমা সব্বাই একসাথে থাকে। তার পিচ্ছি-পুছঁকে কাজিনদের সংখ্যাও কম নয়। সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো আমাদের তিনজনকে। উনাদের অমায়িক ব্যাবহার আমাদের খুব মুগ্ধ করলো। একদিকে মনে মনে লজ্জিত হলাম এতোক্ষণের শংকা নিয়ে অপর দিকে অবাক হলাম এমন কঁচুপোড়া রক্ষণশীল এলাকাতে তাদের প্রসস্থ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখে। কথা-বার্তায় পিয়াকে টিপ্পনী কেটে বুঝিয়ে দিলাম তার প্রতি রায়হানের বিশেষ অনুরক্তির কথা। আপ্যায়ন শেষে এবার ফেরার পালা এলো। পিয়ার কাজিনরা সব ঘিরে ধরলো ঈদের সেলামীর জন্য, ব্যাপারটা রায়হানের উপর ছেড়ে দিয়ে পাশ কাটালাম। পথে রায়হানকে বললাম যেন সে ক্যাম্পাস খুললে পারস্পরিক বোঝাপোড়াকে এগিয়ে নেয়, কিন্তু সে জানালো ব্যাপারটা অসম্ভব প্রায়। কারন, পিয়া কারো প্রতি প্রমিজড। যেটুকু আনন্দ পেয়েছিলাম তা গোল্লায় গেলো। তবে বাসায় ফিরলাম বিচিত্র মজার একটি অভিজ্ঞতা নিয়ে।
তারপর কি হলো জানি না। জানার সুযোগটাও খুব একটা ছিলো না, দেখা হয় নি রায়হান বা শফিকের সাথে আর। হালিমের কথায় কিছুটা অবাক হলাম, সে ও রায়হান একই মহল্লায় তাদের বসবাস এবং তারা বন্ধুও পরষ্পরের। পিয়া-রায়হানের ব্যাপারটা তুলতেই হড়বড় করে সব বেরিয়ে এলো।
পরদিন রায়হান এলো, দেখা হতেই জানালো অসমাপ্ত গল্পের অবশিষ্টাংশ। রায়হানের সাথে পিয়ার বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো এরপর, তবে তা সঙ্গতকারনে স্রেফ বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। বছরখানেক পরে একদিন পিয়া বাসে উঠতে গিয়ে পা ফসকে পড়ে গেলো। হাড়-গোড় ভেঙ্গে, মাথায় চোট পেয়ে একেবারেই কোমায়! কোমায় পিয়ার দেড়টি মাস কাটলো, অথচ এসময়টুকুতে তার তথাকথিত বিএফ এর ছায়াটুকু মিললো না, এদিকে রায়হান সবকিছুতে দৌড়াদৌড়ি আর চোখের জনে প্রাণ যায় অবস্থা। নিখাদ প্রেম থাকলে যা হয় আরকি! প্রিয়ার মারাত্মক কিছু ঘটে গেলে প্রেমিকের মনে আপনাআপনি "পরান যায় জ্বলিয়ারে.. " গান বেজে উঠে। এভাবে মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর পিয়া অবচেনতা থেকে চৈতন্য ফিরে পেলে সে সবার আগে রায়হানকে দেখতে চাইলো। রায়হান ভিতরে গিয়ে প্রচন্ড আবেগে কান্নাকাটি জুড়ে দিলো আর জানিয়ে দিলো তার ভালোবাসার কথা। এতদিন পিয়া অবচেতন থাকলে অনেক কিছুই দেখেছে এবং উপলব্ধি করতে পেরেছিলো। সে জানালো সবুজ সংকেত দিয়ে জানিয়ে বললো "তার আপত্তি নেই, তবে পরিবার যা বলে।"
তারপর রায়হান আরো জানালো অচিরেই তারা বিয়ে করতে যাচ্ছে..। অনেক সিনেমাই দেখেছি সেলুলয়েডের পর্দায়, তবে চোখের পর্দায় এই সিনেমাটি দেখলাম যা মানব-মানবীর নিখাঁদ ভালেবাসার প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো জিবনে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন