ঢাকায় পাখির ডাক বলেতে কাকের কার্কশ কা-কা কিংবা চড়ুইয়ের কিচির-মিচির শব্দ শোনা যায়, এর বাহিরে কদাচিৎ ভোরে দোয়েলের শিস মেলে ভাগ্যজোরে। কিন্তু গ্রামে এলে শোনা যায় হাজারো পাখির হাজারো রকম কুঞ্জন; দোয়েলের শিস, শালিকের ডাক, বাসন্তি কোকিলের কুহু কুহু, ঘুঘুর পানসে কান্না, হুতোম পেচার ভৌতিক চাপা স্বরসহ নাম জানা -অজানা অসংখ্য পাখির ডাক। তবে এসব কিছুর মধ্যে ব্যতিক্রম লাগে "বৌ কথা কও" পাখিটির ডাক। মানুষ্য কান্নার মতো করুন একটি স্বরে ডাকে এই পাখিটি। শহুরে আবহে, ঢাকায়-চট্টগ্রাম বা অন্য কোথাও এই পাখিটির ডাক খুব একটা শুনতে পাই না, কিন্তু আমাদের গ্রামে রোজই শুনতে পাওয়া যায়। ছোটবলায় এই পাখিটির ডাক নিয়ে খুব কৌতুহল ছিলো। খুব কান পেতে শুনতাম "কেমন করে ডাকে পাখিটি" এবং স্বর মেলানোর চেষ্টা করতাম। প্রথমটায় মনে হতো "হোকো তোকো" কিন্তু পরে মনে হতো, না অন্য কিছু বলছে। অন্যদের কাছে জানতে চাইলাম। বুড়োরা কেউ বললো পাখিটি "হক কথা কও" বলে ডাকে , ছেলেরা বললো "বৌ কথা কও" বলে ডাকে পাখটি, কারন তার বৌ হারিয়ে গিয়েছে। স্বরটা মেলালাম, হ্যাঁ, সত্যি তো! স্বরটা মিলে গেছে.. মনে হচ্ছে কেউ যেন কেঁদে কেঁদে ডাকে যাচ্ছে "বৌ কথা কও.." বলে। পাখিটি কেন কেঁদে মরছে তা জানতে চাইলাম বড়দের কাছে। বড় ফুফাতো বোন শোনালো এই করুন কান্নার পেচনের উপখ্যানটি। "এক লোকের ছিলো সদ্য বিয়ে করা এক রুপসী স্ত্রী। একদিন তারা দুর কোথাও যাচ্ছিলো, কোন দেশান্তরে। পথিমধ্যে স্ত্রীর প্রচন্ড পিপাসা পেলো। স্ত্রীকে জঙ্গলের পাশে রেখে পানি খুঁজে আনতে গেলো। এদিকে বন থেকে বাঘ বেরিয়ে তার স্ত্রীকে খেয়ে ফেলেলো। বেচারা পানি নিয়ে ফিরে এসে খুঁজে পেলো না তার স্ত্রীকে। প্রাণপ্রিয় স্ত্রীকে সে হন্য হয়ে খুঁজে ফিরেলো; কিন্তু কোথাও খুঁজে না পেলো না তাকে। সে হাল ছেড়ে দিলো না, প্রভুর কাছে প্রার্থনা করলো যেন তাকে পাখি বানিয়ে দেয়া হয়, সে আমৃত্যু তাকে খুঁজে বেড়াবে, খুঁজে ফিরবে তার প্রিয়তমাকে পৃথিবী ধ্বংশ্বাসন্ন হওয়া পার্যন্ত..। প্রার্থনা মঞ্জুর হলো, সে পাখি হয়ে উড়ে গেলে গাছের মগডালে, সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে খুঁজে বেড়াতে লাগলো "বৌ কথা কও" ডেকে ডেকে।" পাখিটির ডাক শুনলে সব সময়ই নানান কৌতুহল জাগতো, মনে পড়তো তার হারানো বৌটির কল্পিত ছবি.. অসমাপ্ত কোন গল্প..
বাড়ি এসেছি গতকাল, আজ সকালে পাখিটির ডাক শুনতে পেলাম; অনেক দিন পর। তবে সেই বৌহারা ব্যক্তির বৌ এর কল্পিত ছবিটি মনে পড়ে নি এবার, মনে পড়লো বেতের ফলের মতো ম্লান চোখের সেই মেয়েটিকে, কল্পিত একটি চরিত্র। জিবনান্দ দাস যাকে সৃজন করে গিয়েছিলেন তার কবিতায়..
"তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে ।
পৃথিবীর রাঙ্গা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে ;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো ?
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদন জাগাতে ভালোবাসে !"
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন