সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গ্রন্থ-পর্যালোচনা "অনুবর্তন"

গ্রন্থ-পর্যালোচনা:
বইয়ের নাম: অনুবর্তন
লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ পূর্বেও এই উপমহাদেশে টিউশনের অস্তিত্ব


ছিলো ব্যাপারটা বিভূূতিভূষণের অনুবর্তন উপন্যাসটা পড়েই জানতে পারলাম। অবাক করার মতো ব্যাপারটি হলো বর্তমান সময়ের মতো তখনো ছিলো টিউশনে টিচার-গার্জিয়ান বৈরী সম্পর্ক, কথায় কথায় টিচার পাল্টে ফেলার হুমকি, পরীক্ষার সময়ে স্টুডেন্টকে বাড়তি একবেলা করে পড়ানোর অযৌক্তিক আবদার, বেতন-নাস্তা ইত্যাদি নিয়ে খোঁটা দেয়ার প্রবনতা এবং স্টুডেন্টের অর্ধশিক্ষিত কোন নিকটাত্মীয় কর্তৃক স্টুডেন্টকে কিভাবে পড়াতে হবে সে ব্যাপারে টিচারকে অমূল্যবান টিপস বাতলে দেয়ার হাস্যকর ঘটনা ইত্যাদি। অনুবর্তন উপন্যাসটির কাহিনী বিনির্মাণ ঘটে কলকাতার ওয়েলেসলি স্ট্রিটের পিটার লেনের একটি স্কুলকে নিয়ে। স্কুলটির হেডটিচার ছিলেন লর্ড ক্লার্কওয়েল নামক একজন বিলেতি, যিনি ছিলেন বর্তমান সময়ের বিভিন্ন প্রাইমারী স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনের হেডমাস্টারদের মতোই অত্যন্ত কঠোর এবং উগ্র ডিসিপ্লিন্ড একজন প্রধান শিক্ষক; টিচাররা সর্বদা তার বাতলানো নিয়ম-কানুন না মেনে চললে শোকজ, নোটিস কিংবা চাকরিচ্যুত করার হুমকিতে তটস্থ থাকতো। স্কুলটিতে আরো ছিলো নারাণ বাবুর পাঠদানে আত্মউৎসর্গকারী পন্ডিত, ক্ষেত্রবাবুর মতো সদা সিন্সিয়ার শিক্ষক, যদুবাবুর মতো ফাকিবাজ এবং মিস্টার আলমের মতো তেলবাজ ও চালবাজ শিক্ষক। ও হ্যাঁ, আরো দুজন শিক্ষকও ছিলেন স্কুলটিতে, মিস সিবসন নামক বিলেতী একজন ম্যাডাম যাকে আলম সাহেবরা পরে ষড়যন্ত্র করে তাড়িয়ে দেয় এবং রামেদ্রবাবু নামের সেই বিদ্রোহী নতুন টিচারটি। স্কুলটির দিনপাত ভালোই চলছিলো। বিলেতী শিক্ষকদের দ্বারা সন্তানদের বিশুদ্ধ ইংরেজী শেখানোর লোভে অভিভাবকরা তাদের ছেলে মেয়েদের স্কুলটিতে দেদারসে ভর্তি করাতেন। ভালো রেজাল্টের জন্যও স্কুলটির নামডাক ছিলো। কিন্তু একটা পর্যায়ে কলকাতায় আরো অনেকগুলো স্কুল খুললো যারা চটকদার বিজ্ঞাপন আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্টুডেন্ট ভাগিয়ে নিয়ে আসতো। এতে ক্লার্কওয়েল সাহেবের এই স্কুলটি ছাত্রসংকট এবং অর্থশূন্যতায় পড়ে যায়। এরিমাঝে শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি, আলম সাহেবের ষড়যন্ত্র স্কুলটিকে অনেকটা কাদাজলে ফেলে দেয়। শিক্ষকদের সুখের দিনগুলো অর্থসংকট ও অভাবের জালে আটকা পড়ে। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বেশি টাকা মাইনে পাবার চাপাবাজিতে যদুবাবুর কপালে জুটে যায় অবনী নামক উপদ্রপকারী গ্রাম্য দুরাত্মীয়টি। দিনগুলো এভাবেই হয়তো খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে পারতো, কিন্তু তখন বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটা দেখা দেয়। বৃটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী কলকাতায় জাপানীরা আক্রমন করতে পারে এমন আশংকায় কলকাতা খালি হয়ে যায়। শিক্ষকরা পড়ে যায় বিপাকে। তাদের অধিকাংশের এই শহর ছাড়া আর কোথাও কোন আশ্রয় নেই। তাদের সাদামাটা জিবনগুলো রীতিমতো জিবনসংগ্রামে পরিনত হলো। এযুদ্ধ-সংগ্রামে অনেকেই হেরে গেলো যদুবাবুর মতো।  একটি স্কুলের উথান পতন এবং স্কুলশিক্ষকদের অার্থিক সংকটদরুন জিবনযুদ্ধের একটি জীবন্ত দৃশ্যপট চিত্রিত হয়েছে অনুবর্তন উপন্যাসটিতে। রিচয়েতা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজও পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন, তাই হয়তো জিবন থেকে নেয়া প্রতক্ষ্যদর্শী ঘটনাগুলোই নেপথ্য হতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে উপন্যাসটিকে জীবন্ত করে তোলায়।বিভূতিভূষণের "অরণ্যক" ও "আটি আমের ভেপু" এর মতো "অনুবর্তন" উপন্যাসটি হয়তো অতোটা নাম কামাতে পারে নি, তবে আমার পড়া উপন্যাসগুলোর অন্যতম সুখপঠ্য একটি উপন্যাস এটি যার গল্পের প্রতিটি পটেই সমাজের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীর জিবনসংগ্রাম ফুটে উঠেছে অবলীলায় এবং স্বমহিমায়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট (নমুনা)

জনাব মোঃ আশরাফ উদ্দিন, রেক্টর বিপিএটিসি (সরকারের সচিব) , এঁর বিদায় অনুষ্ঠান, তারিখঃ ৩০-মে-২০২৪ ইং, সময়ঃ ১১.০০ ঘটিকা। বিদায় অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্রমধারা   ১) পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত  ২) কর্মচারী ক্লাব এর সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য ৩ ) কর্মচারী ক্লাব এর সভাপতির বক্তব্য ৪ ) জনাব রাজীব কুমার ঢালী, সহকারী পরিচালক এর বক্তব্য ৫) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৬) জনাব শামীম হোসেন, উপপরিচালক এর বক্তব্য ৭) জনাব হাসান মূর্তাজা মাসুম, পরিচালক এর বক্তব্য ৮) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৯) আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের পক্ষ হতে উপ-পরিচালক, আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রাজশাহী এর বক্তব্য ১০) লেডিস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদিকা এর বক্তব্য ১১) জনাব মোঃ আশরাফুজ্জামান, প্রকল্প পরিচালক এর বক্তব্য ১২)  জনাব মোঃ শাহীনূর রহমান, এমডিএস এর বক্তব্য ১৩) জনাব  মোঃ মনিরুল ইসলাম, এমডিএস এর বক্তব্য ১৪) জনাব মোঃ জাকির হোসেন, এমডিএস এর বক্তব্য ১৫) বিদায়ী রেক্টর মহোদয়কে ফুল এবং বিদায়ী উপহার প্রদান  ...

সুবহানাল্লাহঃ পেন্সিল_আর্ট

 

বৈপরীত্য

হয়তো তার মৃত্যুর কথা মনে পড়ে; কারণ, বারেক আলী আবার সেই স্বপ্নটা দেখে,বারবার দেখে;যে স্বপ্নে লম্বা লেজওয়ালা একপাল বুনো কুকুর বা শেয়াল ধস্তাধস্তি করে ছিঁড়ে খায় তার ঝুলে পড়া চামড়ার কোঁচকানো শরীর।সময়ের বিবর্তনে শুকিয়ে আসা চামড়াবহুল শিকার হয়তো তাদের কাছে বিস্বাদ লাগে,ফলে চিবানোর পর গিলতে না পেরে বা দাঁতে না কাটায় ক্ষোভে বিরক্তিতে থুতুর মতো ছুঁড়ে দেয় আকাশের দিকে।কয়েক হাত দূরে গিয়ে সে থ্যাবড়ানো টুকরাগুলো ধূলার সাথে পলট দিয়ে দলা পাকায়।সারল মাংশ না পেয়ে তাদের হিংস্রতা চরমে ওঠে।ভগ্ন-নিথর ও অসহায় দেহটা টানাহেঁচড়া না করে সমর্পিত করে ক্ষুধার্ত হাড্ডিসার মুখগুলোর সামনে। বারেক আলী এ স্বপ্নটা শেষ হলে প্রতিদিনের মতো ভয় পায়,বুকে থুতু ছিঁটিয়ে বিড়বিড় করে---জলপানির ওয়াক্তে দ্যাকা স্বপন ছ্যাঁচা হয়!শব্দকটা শেষ হলে কেমন হাঁপিয়ে ওঠে, দাঁতহীন চোওয়ালের ফাঁক গলে ঘোগলা গড়াতে থাকে;সিথানের নোংরা ত্যানা দিয়ে তা মুছে, এবং নিজেকে চিমটি কেটে জীবিত না মৃত পরখ করার ইচ্ছা জাগে,কিন্তু করেনা;শনের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভোরের অরুণ রাঙা সূর্যের দিকে চেয়ে থাকে নির্লিপ্তভাবে। তবে আজ সে একটি স্বপ্ন বেশি দেখে,যা দেখার পরই সিদ্ধান্...