সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ডাকাতিয়ার কান্না

গ্রামটির নাম একলাশপুর। চারদিকে সবুজের সমারোহ, কাচা-পাকা ঘরবাড়ি, সর্পিল মাটির রাস্তা আর দুধারে সারি সারি সুপার ও আম-কাঠালের বাগান। তবে মাঝে মাঝে ছোট-বড়, খন্ড-অখন্ড ফসলি জমি। বারমাসই হরেক রকমের চাষাবাদ চলে তাতে। এখানকার আষাঢ়- শ্রাবন এলে যেমন চাষানীরা ধান ভানে আর গীত গায় তেমনি শীতে তোলা আলু নিয়ে তারা ঘরের উঘির তল গুলো ভরায়। গায়ের মধ্যভাগ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি নদী। গাঁয়ের পূবপাশ দিয়ে ঢুকে কোথাও ক্ষেতের পাশ দিয়ে ধনুকের মাতো বাকিয়ে কোথাও আবার গঞ্জের হাতাইলে কুনি ভাঙ্গা দিয়ে অনেকটা সাপের চলার ভঙ্গিতে একেবেকে ঠিক মধ্যভাগ দিয়ে গ্রামটির মানচিত্রকে চিড়ে বয়ে গেছে উত্তর-পশ্চিমে। হয়তো গিয়ে মিশেছে দুরের বড় কোন নদীতে। নিশ্চল শান্ত একটা নদী। নেই প্রবল স্রোত, ভাঙ্গে না দু'ধার, ডোবায় না কারো ফসলি জমি কিংবা বাড়ি-ঘর। নেহায়েত ভদ্র গোছের একটা নদী। লোকে বলে "মরা গাঙ্গ"।তবে হ্যা, একদিন এ নদীর ভরা যৌবন ও জল-কুল ছিল।তার ছিল খরস্রোতা মেঘনার মতো উত্তাল ঢেউ, জোস্না- অমাবস্যায় জোয়ার ভাটা, ছিল বর্ষা এলো দু'কুল চাপিয়ে খেত-খামার ঢুবিয়ে হু হু করে ছুটে চলা অথৈ জলরাশি। এবাড়ি ওবাড়ির লোকের তখন নৌকায় করে চলাচল করত। নদীর পাড়ে থাকা কালের বিবর্তনের নীবর সাক্ষী আতিকায় বটগাছটির নিতে মিলত সাপ্তাহিক বাজার।পাল তোলা বড় নৌকা আর দাঁড় টানা ডিঙ্গিতে করে বেপারীরা দুর-দুরান্ত থেকে মালামাল নিয়ে আসতেন। দিনভর রৌদপোড়া কৃষক, গোমটা মুখে শাড়ির আচলে গিটে টাকা বান্ধা গায়ের বধুরা সওধাপাতি কিনতে আসত। আরোও আসত কোনদিন বাজার না দেখা উত্সুক খোকাখুকির দল। তারা এসে হয়তবা বায়না ধরত একটা রঙ্গীন লজেন্স কিংবা একটার বাতাসা কিনে দেবার।সন্ধে হতেই বেচাকেনা সেরে তেল নুন লাকড়ি কিনে বেপারী আর হাটুরেরা নৌকায় করে বাড়ি ফিরত জোস্না অথবা অমাবস্যার সেই রাতগুলোতে নদীতে অন্যরকম একটি উত্সব বিরাজ করত। বিশেষ করে যখন ছোট বড় প্রত্যেকটা নৌকাতে হ্যারিকেন বা কুফি জ্বলে উঠতো জোস্নার প্রতিবিন্ব পড়া নদীটিকে অবিকল আরেকটি তারাভরা আকাশ বলে মনে হতো কিংবা মনে হতো গায়ের কুলটি ধরে প্রজ্বলিত হয়ে উঠেছে হাজারো আলোকদিয়া দুর আকাশে উড়ে যাবে বলে। আজ আর নদীটির সেই রুপ নেই। প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে দুরে মেঘনার মোহনা বাধ দেয়ায় নদী অকালেই বুড়ি হতে চলেছে।আজ তার বুক চিড়ে কোন নৌকা বয়ে চলে না। শেষ রাতে কেউ তার উপর মাটির পিদুম জ্বালিয়ে মাছ ধরে না। কতোদিন হলে গেল নদী বর্নিল সাজের নাওয়ে ছইয়ের ভিতর থাকা ঘোমটায় মুখ ঢাকা রাঙ্গবধুকে দেখে নি? তার পাড়ভাঙ্গা ক্ষ্রিপ্ত সেই স্রোতগুলোও আজ নেই। সে হারিয়ে ফেলেছে তার সব উদ্যোম, উচ্ছলতা ও ক্ষ্রিপ্ততা। নদীর দু'পাড়ের মানুষগুলো তার বিবর্তনের কালসাক্ষী। তাদের সামনেই এ নদীর উথান-পতন। কোন একসময় এ নদীতে বড় বড় রুই-কাতলা, ডাঙ্গর বোয়াল মাছ উঠত। ভোর বেহানে পাড়ের কচুরীফেনার ফাকে ফাকে চিংড়ির আসর বসত, যা ছিল দূস্য ছেলেদের খেপাজালের নিরিহ শিকার। কিন্তু কালের পরিক্রমায় তারও ভাগ্যচক্রে ঘটেছে বিস্তর পার্থক্য। এখন সেখানে রুই-বোয়াল তো দুরে থাক একমুঠো চনোপুটিও মিলে না। আজকাল নদীর পাড় জুড়ে গায়ের লোকের বাধ দিয়ে চাষাবাদ করেছে। নদীর দু'পাশে মাটির উচু ঢিবির ন্যায় বেডি়বাধ করে দিয়েছে যাতে নদীর পানি গড়ান দিয়ে তাদের জমিতে প্রবেশ করতে না পারে। আকারে ছোট করে দিয়ে নদীটিকে। যেন তার সাথে তাদের আজন্ম শত্রুতা। দিন দিন নানান উপায়ে সাবাড় করে দেয়ার চক্রান্ত কষছে। আর নদী?আকারে-আয়তনে অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে তার পরিসর। চাইলেই তার ঢেউগুলোকে এপাড় ওপাড় গড়ান দিতে পারে না। পারে না পাড়গুলোকে ভেঙ্গে নিজেকে একটু চওড়া করে নিতে। তার ঢেউগুলো নিরুপায় হয়ে বাধের খেজুর গাছগুলোর শিকড় পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসে কিংবা অযথাই আচড়ে পড়ে। এই পাড়াগায়ের মানুষগুলো তাকে আজ ভুলে গেছে। তাকে আস্তকুড়ে নিক্ষেপ করেছে সেই বার্ধক্যপ্রবণ পতিতার মতো যার যৌবনের রাসলীলা ফুরিয়ে যাওয়ায় একসময় তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া খদ্দেরগুলোও তার দিকে ফিরে তাকায় না, কেবল দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয়। তবে নদীটি তাদেরকে সন্তানের মতো ভালোবাসে। সে তাদের শত্রুতাকে গায়ে মাখায় না। গৃষ্ম বর্ষায় পানি বিধৌত করে দেয় তাদের জমিগুলোকে। উর্বরতা ও পানি দিয়ে ফসলের বাম্পার ফলন ঘটিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটায়, জিবন বাচায়। আর বিনিময়ে তার পাওনা. . . নিচক গালি "মরা গাঙ্গ", চর দখলের সময় লাঠিয়ালদের মারার আর রক্ত। তাই মনের দু:খে নদী মাঝেমাঝে কেদে উঠে। মাঝে মাঝে রাত্রি গভীর নদীর দুর প্রান্ত থেকে অদ্ভুত ভয়ঙ্কর শ্বব্দ ভেসে আসে। গায়ে লোকেরা বলে "গাঙে আইজ দেয়া আইছে" । কিন্তু না! সেটা হচ্ছে নদীর কান্না। এ প্রজন্মের লোকগুলো তা বুঝে না। হয়ত তারা বুঝত যারা এই নদীর বুক চিড়ে একদিন নৌকা বাইয়াছিল। কিন্তু তারা আজ নেই। তারা আজ মরে পচে গলে একাকার হয়ে গেছে মাটিতে। তাই নদীর দু:খ আরো বেড়ে চলে। সে কেদেই চলে হু হু করে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট (নমুনা)

জনাব মোঃ আশরাফ উদ্দিন, রেক্টর বিপিএটিসি (সরকারের সচিব) , এঁর বিদায় অনুষ্ঠান, তারিখঃ ৩০-মে-২০২৪ ইং, সময়ঃ ১১.০০ ঘটিকা। বিদায় অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্রমধারা   ১) পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত  ২) কর্মচারী ক্লাব এর সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য ৩ ) কর্মচারী ক্লাব এর সভাপতির বক্তব্য ৪ ) জনাব রাজীব কুমার ঢালী, সহকারী পরিচালক এর বক্তব্য ৫) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৬) জনাব শামীম হোসেন, উপপরিচালক এর বক্তব্য ৭) জনাব হাসান মূর্তাজা মাসুম, পরিচালক এর বক্তব্য ৮) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৯) আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের পক্ষ হতে উপ-পরিচালক, আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রাজশাহী এর বক্তব্য ১০) লেডিস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদিকা এর বক্তব্য ১১) জনাব মোঃ আশরাফুজ্জামান, প্রকল্প পরিচালক এর বক্তব্য ১২)  জনাব মোঃ শাহীনূর রহমান, এমডিএস এর বক্তব্য ১৩) জনাব  মোঃ মনিরুল ইসলাম, এমডিএস এর বক্তব্য ১৪) জনাব মোঃ জাকির হোসেন, এমডিএস এর বক্তব্য ১৫) বিদায়ী রেক্টর মহোদয়কে ফুল এবং বিদায়ী উপহার প্রদান  ...

সুবহানাল্লাহঃ পেন্সিল_আর্ট

 

বৈপরীত্য

হয়তো তার মৃত্যুর কথা মনে পড়ে; কারণ, বারেক আলী আবার সেই স্বপ্নটা দেখে,বারবার দেখে;যে স্বপ্নে লম্বা লেজওয়ালা একপাল বুনো কুকুর বা শেয়াল ধস্তাধস্তি করে ছিঁড়ে খায় তার ঝুলে পড়া চামড়ার কোঁচকানো শরীর।সময়ের বিবর্তনে শুকিয়ে আসা চামড়াবহুল শিকার হয়তো তাদের কাছে বিস্বাদ লাগে,ফলে চিবানোর পর গিলতে না পেরে বা দাঁতে না কাটায় ক্ষোভে বিরক্তিতে থুতুর মতো ছুঁড়ে দেয় আকাশের দিকে।কয়েক হাত দূরে গিয়ে সে থ্যাবড়ানো টুকরাগুলো ধূলার সাথে পলট দিয়ে দলা পাকায়।সারল মাংশ না পেয়ে তাদের হিংস্রতা চরমে ওঠে।ভগ্ন-নিথর ও অসহায় দেহটা টানাহেঁচড়া না করে সমর্পিত করে ক্ষুধার্ত হাড্ডিসার মুখগুলোর সামনে। বারেক আলী এ স্বপ্নটা শেষ হলে প্রতিদিনের মতো ভয় পায়,বুকে থুতু ছিঁটিয়ে বিড়বিড় করে---জলপানির ওয়াক্তে দ্যাকা স্বপন ছ্যাঁচা হয়!শব্দকটা শেষ হলে কেমন হাঁপিয়ে ওঠে, দাঁতহীন চোওয়ালের ফাঁক গলে ঘোগলা গড়াতে থাকে;সিথানের নোংরা ত্যানা দিয়ে তা মুছে, এবং নিজেকে চিমটি কেটে জীবিত না মৃত পরখ করার ইচ্ছা জাগে,কিন্তু করেনা;শনের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভোরের অরুণ রাঙা সূর্যের দিকে চেয়ে থাকে নির্লিপ্তভাবে। তবে আজ সে একটি স্বপ্ন বেশি দেখে,যা দেখার পরই সিদ্ধান্...