বশির স্যারের ‘পাবলিক ফিন্যান্স’ ক্লাসটা করে ডাকসুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আধঘণ্টা পর সাড়ে বারটায় একটা বাস আছে। কিন্তু মিস করব। কারন আজ নীরাকে স্যরি বলতেই হবে। জানুটা বেশ ক’দিন ধরে রেগে টং হয়ে আছে। রিলেশন প্রায় ব্রেকআপ হওয়ার পথে। একটাই তার অভিযোগ "আমি নাকি এখন আর তাকে আগের মতো ভালবাসি না। আমি আশামণিকে নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে গেছি। আমার জীবনে যখন আশামণিই সব তখন আর তার কি দরকার।” সেদিন ফোনে খুব কাঁদল, বিদায় নিতে চাইল আমার জিবনের অধ্যায় থেকে। তাই অনেক বলে কয়ে তাকে ফেরালাম। তবে সে শর্ত জুড়ে দিলো আজ ক্লাসের পর ডাকসুর সামনে দেখা করতে হবে এবং মিতা, শান্তা সবার সামনে স্যরি বলতে হবে। তাহলেই সে রিলেশন কন্টিনিউ করবে। হয়ত মহারানী যা বলবেন তাই হবে।
ঠায় দাড়িয়ে আছি। ওদিকে আবার আশামণির জন্যও খুব টেনশন হচ্ছিল। কী করছে আমার আম্মুটা? স্কুল থেকে কি ফিরলো?
খানিক পরে দেখা গেলো আমার মহারাণী আসছেন। একপাশে তার উজিরে আযম মিতা আর অন্যপাশে সেনাপতি শান্তা।
নীরা সোজা এসেই আমার মুখের উপর কথা ঝাড়লো
“স্যরি বলো!”
“স্যরি”
“একবার নয় তিনবার বলো!"
অগত্যা দ্বিতীয় বার বলতে যাব ঠিক তখনই সেলফোনটা বেজে উওঠলো। রিসিভ করে কানে ঠেকাতেই রহিমা খালার ভয়ার্ত কন্ঠ ভেসে উঠলো;
“বাজান, আশামণিরে কোনহানেই পাইতাছি না’”
কলজেটা কেঁপে উঠলো। “দ্রুত আসছি” বলেই ফোনটা পকেটে পুরে দৌর দিলাম। হাতের ঝটকায় নীরার হাতে থাকা তরতাজা গোলাপটা আমার পায়ের নিচে চাপা পড়ল। হয়ত আমাকে দেয়ার জন্য
এনেছিল। পিছন থেকে নীরার কান্নারুদ্ধ চিৎকার শুনতে পেলাম ‘আসিফ’!!! কিন্তু ফিরে তাকানোর সুযোগ পেলাম না।
দৌড়ে টি এস সির মোড়ে গিয়ে দেখি হেমন্ত বাসটি তখন চলে যাবার জন্য ডাচের সামনে দিয়ে ইউটার্ন নিচ্ছে। শাহাদাত ভাইকে চিৎকার করে ডেকে হাত জাগিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। বাস একটু স্লো করতেই লাফিয়ে উঠলাম। পাশ থেকে কে যেন জিজ্ঞেস করলো “কি হয়ছে?” কিন্তু প্রচন্ড হাফানীতে জবাবতায় দিতে পারলাম না।
বাসায় পৌছতে পৌছতে ২টো বেজে গেলো। সারাটা বাস শুধু ফোনের উপর ফোন চলল। কিন্তু কেউ কোন হদিস দিতে পারল না। বাসায় পৌঁছে দেখি রহিমা খালা দরজায় কেঁদে গড়াগড়ি দিচ্ছে। আশপাশের প্রতিবেশীরা সব জায়গায় চষে খুজে বেড়াচ্ছে। পাশের ডোবাটা, কয়েকশ গজ দক্ষিণের বস্তিটা; সবই তন্ন তন্ন করে খোজা শেষ। কিন্তু কোথাও সে নেই! কোথায় উধাও হয়ে গেলো ছোট্ট এই মেয়েটা? আমি দৌড় দিলাম তার স্কুলের প্রিঞ্চিপাল মিস কানিজ ফাতেমার বাসায়। একে একে পুরো এলাকাটা চষে বেড়ালাম। মসজিদ হতে মাইকিং করা হলো। কিন্তু কোন সন্ধান পেলাম না। যেন একেবারেই হওয়া হয়ে গেলো।
******
দুদিন ধরে চোখের পাতা এক করতে পারি নি। চারদিকে ফোন দেয়া, থানায় জিডি করা, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া; কিন্তু কিছুতেই কোন ফল হল না। চরম ক্লান্তিতে শরীরটা ভেঙ্গে আসলো। সন্ধ্যার আলোটা জ্বালিয়ে খালাকে কফি দিতে বললাম। কফির পেয়ালায় চুমুক বসিয়ে সোফায় গা’টা এলিয়ে দিলাম। ক্লান্তি কিছুটা কমে এলো, তবে চিন্তায় কোনো ছেদ পড়লো না। চিন্তার অথৈ জলে হাবুডুবু খেতে লাগলাম। আমি কি আমার ছোট্টমানিকে আর পাব না? আমি কি খোয়াতে যাচ্ছি আমার বোনের রেখে যাওয়া একমাত্র নিদর্শনকে? আমি কি হারাতে যাচ্ছি আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনকে?
??
আমি আসিফ, এবার ঢাবিতে লোক প্রশাসন বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পা রাখলাম । হ্যাঁ, পরিচয়টা এতোটুকুতেই শেষ নয়। আমার ছিল ছোট্ট একটি সুখের পরিবার। তাতে ছিলাম আমি, আমার বড় আপু আর দুলাভাই।চাঁদপুরের এক মফস্বলে আমার জন্ম এবং বড় হয়ে উঠা। বাবাকে হারিয়েছি সেই ৬ষ্ঠ শ্রেণীতেই আর মাকে ৮ম শ্রেণীতে। কিন্তু আপু আমাকে বাবা মা হারা্নোর বেদনাটা অনুভব করতে দিলো না। সে আমাকে নিয়ে এলো তার নিজের কাছে; আশুলিয়ায়। দুলাভাই ফারিদ সাহেব এখানে একটা প্রাইভেট ফার্মে জব করেন। জমি কিনে এখানে একটি বাড়িও করেছেন। আপু এখানে আমাকে ঠিক নিজের সন্তানের মতো করেই যত্ন করতে লাগলেন। আর দুলাভাই তো তার সালাবাবুকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন।
আপু আমাকে সাভার ক্যান. পাবলিকে ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমার দিন গুলো একে একে কেটে যাচ্ছিল। এইচ.এস.চি. শেষ করে এবার উচ্চ শিক্ষার পালা। বেশ ক’টি ভার্সিটিতে ভর্তি পরিক্ষা দিলাম। শুধু চবিতে এলো। বাধ্য হয়ে চট্টগ্রামের পথে পা বাড়ালাম। আপু যেতে দিতে চাইল না; খুব কাঁদল। সে চাইলো প্রাইভেটে ভর্তি করিয়ে দিবে। কিন্তু না, আর কতোদিন আপুর আঁচলতলে থাকব? এবার পৃথিবীটাকে নিজের মতো করে দেখতে চাই। আপুক চোখের জলে বিদায় জানাল।
চবিতে দিনগুলো বড্ড এলোমেলো ভাবে যাচ্ছিল। সারাক্ষণ আপুর জন্য কাঁদতাম। সে বছরটা প্রায় কেটে এভাবেই যাচ্ছিল। একদিন শুনি আশুলিয়ায় আপুর বাসার অদুরেই তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশন গারমেন্টসে ভয়াবহ আগ্নিকান্ডের ঘটনা। আপুর জন্য ভয়টা আরও বেড়ে গেলো। হটাৎ যেকোনো ভাবেই হোক সেকেন্ডটাইম পরীক্ষা দিয়ে ঢাবি আথবা জাবিতে ভর্তি হবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফেললাম। আপুকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না। একদিন ব্যাগ-বই সব গুছিয়ে বাসায় এসে হাজির হলাম।
আপু আমাকে দেখে যতটানা অবাক হলো তারচেয়ে বেশি নিজেই অবাক হলাম আপুর কোলে প্রায় ৮মাসের বাচ্চাটি দেখে। চুলের মুঠি ধরে বললাম
“তুই একটি বারের জন্যও আমাকে জানালি না? তোর সাথে আমি আর কথা বলব না”।
আপু চুলের মুঠি চাডিয়ে নিয়ে স্মিথ হেসে বলল। “রাগ করিস না ভাই আমার, এটা ছিলো তোর জন্য সারপ্রাইজ”
“হুম, বড্ড রকম সারপ্রাইজ বটে” হেসে দুলাভাই কাধে হাত রাখলেন।
ছোটআম্মিটাকে নিয়ে দিনগুলো ভালই কাটছিল। সারাক্ষণ আমি তাকে কোলে কোলে রাখতাম, আপুকে তার ভাগই দিতে চাইতাম না। এদিকে ভর্তি পরীক্ষা হয়ে গেলো, চান্স হয়ে গেলো ঢাবির লোক প্রশাসন বিভাগে। সেবার রাজনৈতিক গোলযোগ থাকায় ক্লাস শুরু হতে প্রায় ফেব্রুয়ারী মাস চলে এলো। বাসা হতে আসা যাওয়া করাটা কষ্টসাধ্য হওয়ায় হলে উঠে পরলাম। তবে হ্যাঁ, সাপ্তাহ শেষ হয়ে বৃহস্পতিবার আসতেই বাসায় ছুটতাম, আমার ছোট্টমণিকে দেখতে।
দেখতে দেখতে প্রায় বছর দুটো ভালো ভাবেই কেটে গেলো। একটা রিলেশনেও জড়ালাম ‘নীরা’ নামের পাগলী মেয়েটার সাথে। তবে সময়গুলো যেন খরস্রোতা নদীর মাতো দ্রুত বহমান। ১৫এর শুরুর দিকে এসে আপুর জরায়ু ক্যান্সার ধরা পড়ল। প্রচুর চিকিৎসা চলল, কিন্তু আপুকে আর বাঁচানো না। শেষদিনগুলোতে আপু রোগীর বিছানায় শুয়ে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেন আর কাঁদতেন। শেষে যাবার আগের আমার হাতের মুঠি চেপে ধরলে বললেন “ভাই আমার আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু আমার প্রাণটাকে তোদের কাছে রেখে যাচ্ছি। তুই তাকে আদর দিয়ে বড় করে তুলবি। বল কি পারবি না?” আমার চোখ দিয়ে শুধু জল গড়িয়ে পড়ল, কোন জবাব দিতে পারলাম না।
মাস কয়েক পর এবার দুলাভাইকে বিদায় দেয়ার পালা এলো। তিনি চলে যাচ্ছেন সৌদিতে। সেখানে একটি পেট্রলিয়াম কম্পানীতে তার জব হয়েছে। আসলে আপুর মৃত্যুতে তিনি খুব ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তদুপরি আপুর চিকিৎসা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে জবটাও খুইয়েছেন। তাই আর বাধা দিয়ে রাখতে পারলাম না। ফলে আমিই হয়ে গেলাম আশামাণির মা-বাবা। হল ছেড়ে দিলাম। বাসা নিলাম মহাম্মাদপুরে আর রহিমা খালাকে রাখলাম রান্না-বান্না ও অনান্য কাজে সহায়তা করার জন্য।
******
২০১৬ এর সূচনাটা খুব একটা ভালো ভাবে শুরু হয় নি। খরচ বেড়ে যাওয়ায় মহাম্মাদপুরের বাসাটাতে থাকাটা অসম্ভব হয়ে গেলো। অন্যদিকে আপুদের বাড়ীটাও প্রায় অরক্ষিত থাকায় দুলাভাই সেখানে চলে যেতে বার বার তাগাদা দিচ্ছিলেন। সব শেষে বাসাটা ছেড়ে দিয়ে আশুলিয়ায় গিয়ে উঠলাম। আশামণির বয়স প্রায় সাড়ে চার বছর হয়ে আসায় তাকে বাসার আদুরে একটা কিন্টারগার্ডেনে ভর্তি করিয়ে দিলাম। রহিমা খালা রোজ সকালে তাকে দিয়ে আসেন এবং দুপুরে গিয়ে নিয়ে আসেন। আমার জিবনযুদ্ধটাও নতুন একটা রুপ ধারন করল। রোজ ভোঁরে বাঁদরঝোলা হয়ে বাসে করে ক্যাম্পাসে যাওয়া, বিকেলে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরা, রোজ নীরার ঝাড়ি খওয়া আর দুপুরে ফোনে আশামণির কান্না “মাম্মা, তুমি কখন আসবে?” “এইতো আম্মি,তুমি খেয়ে দেয়ে ঘুমাও, আমি চলে আসছি”।
********
বেশ ক’দিন ধরে একটা ব্যাপার নিয়ে খুব টেনশন ফিল করছি। সারাদিন ভার্সিটিতে ক্লাস থাকায় আশামণিকে খুব একটা সময় দিতে পারি না। শুক্রবার ও শনিবার ক্যাম্পাস বন্ধ থাকে, সেদু’দিন তাকে নিয়ে বিকেলে হাটতে বের হই। সাপ্তাহকয়েক আগে সেদিন বিকেলে তাকে নিয়ে হাটতে হাটতে সেখানটায় গেলাম, যেখানে তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসটা ছিল। বিপত্তিটা বাঁধল ফিরার পথে। তখন প্রায় গোধূলিলগ্ন, আসার পথে হটাত রাস্তার অপর দিকে আমাকে দেখালো;
“মাম্মা! দেখ, আম্মু ডাকছেন”
খুব একটা পাত্তা দিলাম না। ভাবলাম গার্মেন্টস ফেরত কোন মহিলা হয়ত দুষ্টামি করে তাকে ডেকেছে। তারপর থেকে আশামণি রোজ সেদিকে যেতে বায়না ধরতে লাগল। আবার কার সাথে যেন মাঝে মাঝে একা একা কথা বলে। জিজ্ঞেস করলে “আম্মুর সাথে কথা বলছি”। আমি আশামণিকে একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্টকে দেখেলাম, তিনি বললেন
“হয়ত স্কুলে অন্যদের মা-বাবাকে দেখে নিজের মাকে খুব মিস করছে, ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে”।
একটা কৌশল খাটালাম। নীরাকে মাঝে মাঝে ফোনে তার সাথে ধরিয়ে দিতাম “আম্মুর সাথে কথা বলো”। সে ফোন ধরে শুধু বলে “ আম্মু তুমি কখন আসবে?” নীরা উত্তরে বলে “কাল”। তবে সেই কাল কালই থেকে যেত। ভোর আর পহাত না।
আশামণিকে নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, নীরাকে খুব একটা সমায় দিতে পারছি না। এনিয়ে নীরার সাথে খুব ঝগড়া হয়ে গেলো। আমি নাকি তাকে আগের মতো ভালবাসি না। কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। সত্যকে তো আর মিথ্যার আড়ালে ঢাকা যায় না।
********
সেদিন ছিলো সোমবার। ভোরে উঠে ভার্সিটি যাবার জন্য রেডি হলাম। বের হবার সময় আমার ঘুমন্ত পরীটার কপালে চুমো একে দিতেই সে জেগে উঠল।
“মাম্মা, তুমি কোথায় যাচ্ছ? আজকে আমাকে আম্মু নিতে আসবেন বলেছেন”।
“সত্যি, তাই?” ভাবলাম, নীরা হয়ত রাতে ফোনে বলেছে।
“আম্মু কিন্তু এবার পাক্কা কথা দিয়েছে”
“হুম, তাহলে ভালই”
ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। আজ ফিরতে একটু দেরি হবে।রাতে আনেক কষ্টে নীরার রাগ ভাঙ্গিয়েছি। সে দুপুরে ডাকসুর সামনে থাকবে বলেছে। তাকে স্যরি বলতে হবে।
*********
আজ নিয়ে তিনদিন হয়ে গেলো আশামণি নিখোঁজ।মুখ গুমোড় করে বসে আসি; ভার্সিটি যাইনি। দরজায় কড়া নড়ল। দরজা খুলতেই দেখি তানিশা এসেছে তার মায়ের সাথে। তানিশা আশামণির বান্ধবী এবং ক্লাসমেট।
“তোমার আশামণিকে তো খুঁজে পাচ্ছি না” বলতেই সে ঢুকুরে কেঁদে উঠল। পরক্ষণে সে কথায় কথায় বলল
“সে তো তার আম্মুর সাথে বাড়ী গেছে”
“আম্মুর সাথে?” উত্তেজনায় আমার গলা প্রায় ধরে এলো।
“ হ্যাঁ, তিনি তাকে রোজই স্কুলে দেখতে আসতেন আবার চলে যেতেন”
আমি থ মেরে গেলাম। তবে বুঝতে আর বাকি রইলো না যে ঘটে যাওয়া পুনপৌণিক ঘটনাগুলোর
মধ্যে কোথাও যেন একটা সুপ্ত রহস্য আসে।
একটুকরো কাগজে তানিশার বর্ণনা আনুসারে সেই মহিলার পেন্সিল স্কেচ একে নিলাম। নাহ চেহারাটা আপু, নীরা কিংবা রহিমা খালা করো সাথেই মিলছে না। তাহলে মহিলাটা কে???
***********
দুপুরে পুরোনো আলমারীটাতে কিছু পুরনো ডকুমেন্টস খুঁজছিলাম। ডায়ারের এককোণে একটা ফ্যামেলী এ্যালবাম এবং একটা মোটা ডায়েরি পেলাম। খুলে দেখলাম ডায়েরিটা আপুর। কৌতূহলবসত খুললাম। আমি অবাক হলাম আপুর সব কান্ড কারখানা দেখে। অনেককিছুই পেলাম তাতে। আমার ছোটবেলার কাজল পরিয়ে নেয়া পায়ের চাপ, হাতের চাপ, তার জিবনের নানান ঘটনা আরো কতো কি? সামনে আরও আগালাম। একটা পাতায় হটাত চোখ আটকে গেলো, ১৬/৪/২০১২ এর তারিখ দেয়া। আপু লিখেছে...
“আমি বোধ হয় মাতৃত্বের স্বাদ নিতে পারবো না। আজ ডাক্তার বলেছে আমার জরায়ুতে নাকি টিউমার ধরা পড়েছে। হায় নিয়তি তুমি কেন এতো নির্মম?”
আমার চোখ কপালে উঠে গেলো। ভেবে কুল পেলাম না তাহলে একি আমার আপুর গর্ভজাত সন্তান না? আরো সামনে এগোতে লাগলাম। প্রায় শেষের দিকের একটি পাতায় এসে দৃষ্টি আতকে গেলো। ২৭/১১/২০১২ এর তারিখ দেয়া।
“বিধাতা হয়ত আমার প্রতি অনুগ্রহের দৃষ্টি দিয়েছেন। আমরা একটি বাচ্চা দত্তক নিতে যাচ্ছি। আনঞ্জু আপার মাধ্যমে......”
চরম উত্তেজনায় আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। দুলাভাইকে ফোন দিলাম। তাকে আশামণির নিখোঁজের ব্যপারটা ভয়ে জানাই নি পাছে যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে। আজো ব্যাপারটা চেপে গেলাম আর কথায় কথায় জিজ্ঞেস করে নিলাম ডায়েরির কথা এবং আশামণির দত্তক নেয়ার কথা। তিনি জানালেন উপজেলা মেডিকেলের নার্স আনঞ্জু এর কথা। রাতে নীরাকে ফোন দিয়ে সব খুলে বললাম এবং কাল আসতে বললাম।
*********
সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ নীরা আসল। তাকে নিয়ে ছুটে গেলাম আন্জু আপার খোঁজে। মেডিকেলেই তাকে পেয়ে গেলাম। আপু দুলাভাইয়ের বিস্তারিত পরিচয়ের দিয়ে তাকে জেকে ধরলাম আশামণির প্রকৃত বাবা-মায়ের সন্ধান দিতে। প্রথমে সে ভয়ে কুঁচকে গেলো, কিন্তু অভয় দিয়ে জিজ্ঞেস করতেই জানা গেলো বেদনাক্লিষ্ট ঘটনাটি।
“সেদিন ২৪ নভেম্বর,২০১২, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে ঘটে গেল ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। পুড়ে গিয়ে আথবা লাফিয়ে পড়ে নিহত হন প্রায় ১২৬ জনের মতো পোশাককর্মী। তবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরো বেশি। মালিকপক্ষ ও রাজনৈতিক মহলের চাপে অনেক লাশ গুম করে ফেলা হয় কিংবা বেওয়ারিশি লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। পুড়ে যাওয়া অধিকাংশদের ঢামেকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে লাফিয়ে পড়ে হত নিহত হতভাগ্যকে এখানে পাঠানো হয়। জনৈক উদ্ধারকর্মী মাথা থেতলানো এক নারীকে প্রায় মুমূরষ অবস্থায় নিয়ে আসেন। তার কোলে জোড়ানো তার সন্তান। প্রচুর রক্তক্ষ্ণনের দরুন নারীটি অল্পকিছুক্ষণের মারা যায়। তবে কোলে অক্ষত থাকা আদুরে ধনটি বেঁচে যায়। রাতেই চাপ আসে লাশ সরিয়ে ফেলার। বাচ্ছাটিকে বাচানোর তাগিদে আঞ্জু বেগম পূর্বপরিচয়ের সূত্রতায় তাকে আমার আপু-দুলাভায়ের হাতে তুলে দেন।
এবার ছুটে গেলাম “তাজরিন ফ্যাশন নিহত শ্রমিক কল্যাণ সমিতি”র সাধারন সম্পাদক মতিন ভায়ের কাছে। বিস্তারিত শুনার পর তিনি সহায়তা করতে রাজী হলেন। পুরনো সব খবরের কাগজ, নিহত ও নিখোঁজদের ছবিসহ তালিকা বের করলেন। তানিশার বর্ণনা আনুযায়ী আঁকা পেঞ্চিলের স্কেচের সাথে সব ক’টি ছবি মিলালাম, এক ২২-২৩ বছর বয়সী নারীর সাথে স্কেচের চেহারা প্রায় মিলে গেলো। নাম আমেনা বেগম। হুম, নিখোজের তালিকায় থাকা এই নারীই তার নিজ প্রান বিসর্জন দিয়ে বাচিয়ে গিয়েছিলেন তার আদুরে সোনামণিকে। আগুন থেকে বাঁচতে সন্তানকে কোলে মুড়িয়ে লাফিয়ে পড়েন তিন তালা থেকে। কিন্তু মাথায় প্রচন্ড আঘাতপ্রাপ্ত হন। মারা জান তিনি আর বেঁচে যায় তার সন্তান।
অনেক খজাখুজির পর সেই বস্তিতে গিয়ে তার এক নারী সহকর্মীর সন্ধান পেলাম। পোড়া স্মৃতি তিনি শুধু হৃদয়েই নয় সমস্ত অংজুড়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন। নিয়তির নির্মমতা তাকে আজ বিকলাঙ্গ ভিক্ষুকে পরিণত করেছে। তিনি দেখালেন যে জুপড়িটায় আমেনা বেগম থাকতেন তার নাড়ী ছেড়া ধনকে নিয়ে। তার বাবার ব্যপারে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম হতচ্ছাড়াটা সেই দুর্ঘটনার ৩ মাস আগেই, আশামণির যখন সাড়ে পাঁচ মাস, অন্য একটি বিয়ে করে চলে যায়। আর কখনো একটিবারের জন্যও তাদের খোঁজ নিতে আসে নি।তবে তাদের অন্যান্য আত্মীয়-সব্জন কিংবা বাড়ীর ঠিকানা সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারে নি।
************
সমস্ত দিনের ক্লান্তি শেষে যখন বাসায় ফিরছি তখন ঠিক গোধূলিলগ্ন।সেই পথটি ধরেই হাঁটছি যেটি ধরে হয়ত কোন একসময় আশামণিকে তার মায়ের কোলে তার কর্মস্থলে যেতেন। আমার আর নীরার চখ-মুখে তখনো বিস্ময়ের চাপ। হটাত রাস্তার ওপারটাতে দেখলাম আশামণি এক নারীর সাথে দাড়নো। সে আমার দিকে তাকিয়ে টা টা দিচ্ছে। আমি দৌড় দিতে যাবো ঠিক তখনি নীরা আমাকে টেনে ধরল। নীরা জিজ্ঞেস করল “কি হয়েছে? যাচ্ছ কৈ?”
“ওইতো আশামণি” বলে হাত বাড়িয়ে দেখালাম। কিন্তু না সেখানে কেও নেই। জানি না হয়ত তা ছিলো কোন রহস্যময় সত্য কিংবা শুধুই মতিভ্রম।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন