সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঝরাপাতা

মেয়েটির নাম নীলাঞ্জনা নয়, তবু নীলাঞ্জনা বলেই ডাকতাম। কলেজে ফাস্ট ইয়ারে খুব একটা ক্লাস করি নি, শুধু মাঝে মাঝে এসে ঢু মেরে যেতাম নামটাকে হাজিরা খাতায় টিকিয়ে রাখার জন্য সত্যি বলতে কি, আমি আমার ক্লাসমেটদেরও খুব একটা চিনতাম না, বা তারাও আমাকে চিনত না আর কিভাবেই বা চিনবে? আমি যে ক্লাসই করতাম না! অবশ্য কিছুই করার ছিল না S.S.C. পরীক্ষার বেশ কিছুদিন আগে বাবা পরপারে পাড়ি জমান আর যাবার সময় মা আর ছোট্ট বোন টিনাকে আমার ঘাড়ে রেখে যান তারপর থেকেই শুরু হয়েছিল বিবর্ণপ্রায় রাজপথটিতে আমার অন্য রকম জিবন সংগ্রাম S.S.C. পরীক্ষা দিয়েই একটা জবে ঢুকে যাই, পাশাপাশি পড়লেখার ঘানি টানার সিদ্ধান্ত নেই জিবনটা অন্যরকম হয়ে গেলো।
যাগগে, সেদিকটা আর নাই মাড়াই। সেকেন্ড ইয়ারে উঠে কড়া সিদ্ধান্ত নিলাম যে, নিয়মিত ক্লাস করব, চাকুরিকে বিদায় দিলাম পাড়ায় দুটো টিউশনি জোগাড় করে ফেললাম দিনক্ষণের কথা মনে নেই একদিন হুড়মুড় করে ক্লাসে ঢুকে পড়লাম, বসে গেলাম একবারে সামনেই। একটা ছেলে এসে জামেলা পাকাতে চাইল। ঘুষি মেরে নাকটা ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো, এ প্রজাতির কিছু ছেলেপেলে কেন যেন ক্লাসের সামনের সিটটাকে তার বাবার সম্পত্তি মনে করে না কিছু করতে হলো না দেখি শ্যাম বর্ণের একটা মেয়ে এগিয়ে এসে বল্লঃরবিন! এমন করছিস কেন? প্রতিদিন তুই যে সামনে বসবি এমনটা কি কোথাও লেখা আছে?’ পরক্ষণই আমার পাশে এসে বলল তোমাকে তো আগে কখনো দেখি নি!উত্তর দিলাম আমি আগে খুব একটা আসি নাই” “ও তাই? আমি নওশীন, তোমার ইয়ারমেটবলেই হাতটা বাড়িয়ে দিলো
এতক্ষণে মেয়েটার দিকে একটু সাহস করে্ তাকালাম। নীল একটা ড্রেস পড়েছে মেয়েটি
চোখের উপর হালকা নীলাভ একটা মেকআপের আবরণ দেয়া গায়ের রঙ্গটা ফর্সা না, উজ্জল শ্যামল; তবে মন্দ নয়
তারপর থেকে প্রতিদিন আধ-আধটু কথা বলতে বলতে বন্ধুত্ব জমে উঠে
দেখা হলেই জিজ্ঞেস করত নাকীব! কেমন আশিস রে? উত্তরে শুধু মাথা নাড়াতাম একটা জিনিস খুব চোখে পড়ল, মেয়েটি প্রায়ই নীল পোষাক পড়ে আসে একদিন জিজ্ঞাস করলাম কিরে তুই সব সময় নীল ড্রেস পরে আশিস কেন?” স্মিথ হেসে উত্তর দিলো নীল রঙ আমার খুব পছন্দ বললাম তাহলে তো তোকে নীলাঞ্জনা বলে ডাকতে হয়বলল আচ্ছা, ডাকিস
নীলাঞ্জনার সাথে বন্ধুত্বটা আরও গাড় হতে লাগল
ক্লাসে আমার যে কয়জন ভালো বন্ধু ছিল, তার মধ্যে সেও একজন সাদ্দাম,শফিক আর নিতুর কথাও না বললে নয় সারাক্ষণ একসাথে আড্ডা মারা, ফুসকা খাওয়া, text করা চলত একটা সময় মনে হলো তার প্রতি আমার দুর্বলতা বেড়ে যাচ্ছে কিন্তু সাহস করে বলতে পারছি না একদিন হঠাৎ সব মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আসলাম যে আজ বলেই ছাড়ব ক্যাম্পাসে এসে দেখি নীলাঞ্জনা কার যেন হাত ধরে ঘুরছে খুব কষ্ট পেলাম পিছু ফিরতে যেতেই তার ডাক শুনলামঃ কিরে কেমন আশিস?” “হুম, এইতো চলছেউত্তর দিলাম
চল তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিএ আসফাক
আমার ...
ও হ্যাঁ, তাই! আমি নাকীব নওশীনের ফ্রেন্ডবলেই হাত বারিয়ে দিলাম, কষ্টটা বুকে চেপে

দিনগুলো হঠাৎ কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল
কাঁচের স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে গেল মাঝে মাঝে খুব কান্না পেত, কিন্তু কাঁদতে পারতাম না নীলাঞ্জনাও আমার সাথে কথা বলা কমিয়ে দিলো নাওয়া খাওয়া তো প্রায় ছেড়ে দিলাম। এক সন্ধ্যায় মা খুব কাঁদলেন বাবা তুই হঠাৎ এমন করছিস কেন? তোর বাবার স্বপ্নগুলো কি ভেঙ্গে দিবি? টিনার কি হবে?” অনেক কষ্টে মায়ের কান্না থামালাম, তবে তিনি দিব্যি করিয়ে ছাড়লেন, আগের মতো লক্ষ্মীটি হয়ে যাব।
দেখতে দেখতে টেস্ট পরীক্ষা চলে এলো হরদম প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছি একদিন নীলাঞ্জনাকে দেখলাম খুব টেনশিত কিরে পরীক্ষা কেমন দিচ্ছিস? উত্তর পেলামভাল, মোটামুটিতবে তার গোমড়া মুখ তা বলছে না
সেদিন অর্থনীতি ২য় পত্র পরীক্ষা ছিলো
হলে ঢুকার আগে নীলাঞ্জনাকে দেখলাম চোখদুটো ফোলা ফোলা কি হয়েছে জিজ্ঞেস করে উত্তর পেলাম না, পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে আবার ছুটে গেলাম, এবার সে আমার গলাটি ধরে শিশুর মতো কেঁদে ফেললো, বলল তোদেরকে আমি খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছি না? আর দিব নাআর কিছু জিজ্ঞেস করে উত্তর পেলাম না, বুঝলাম আসফাকের সাথে কিছু হয়েছে ছেলেটি খুব কষ্ট দেয় নীলাঞ্জনাকে, খুব ঝগড়া করে নিতুর কাছে শুনতাম, সে আমাকে নিয়ে নীলাঞ্জনাকে আনেক বাজে কথা বলে, ফ্রেন্ডদের সাথে মিশতে বারন করে। নীলাঞ্জনা সব চোখ বুঝে সহ্য করত, কিছু বলত না।
সারাদিন আনেকবার ফোন দিয়েও আর reply পেলাম না
রাত তখন ১ টা ছুই ছুই করছে প্রায়। নিতুর ফোন এলো। নিতু কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে উঠল নওশীন আর নেই, সে গলায় ফাঁস দিয়েছেনিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না দৌড়ে ছুটে বেরিয়ে এলাম গন্তব্য আজানা সেই ভয়াল রাতটি ধরে চট্টলা নগরীর সবগুলো হাসপাতাল চষে ফেললাম, কিন্তু না, তার নিথর দেহটি আর সজাগ হল না
তারপর নওশীন হত্যার বিচার চাই,” “আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীদের ফাঁসি চাইপ্ল্যাকার্ড নিয়ে আন্দোলন হলো, মানববন্ধন হলো, দেশব্যাপী ঝড় উঠেছিলো সে সময়ে
একটা সময় প্ররোচক ফাসির দণ্ডাদেশ পেল সময়টা ৩ বছর গড়িয়ে এলো অনেক কিছুই বদলে গেলো আজ ভারসিটিতে ৩য় বর্ষে পড়ছি শুনলাম আসফাকের রায় কার্যকর হতে যাচ্ছে সামনে হয়ত হবে, কিন্তু নীলাঞ্জনা আর ফিরে আসবে না আর কার্যকর হলেই বা কি, আজকাল এই বাংলার প্রতিটি প্রান্ত থেকে রোজ রোজ নতুন আসফাক জন্ম নিচ্ছে, আর নীলাঞ্জনার মতো হাজারো মেয়ে প্রকৃত ভালবাসাকে ভুল বুঝে ছলনাময় ভালোবাসার ফাদে পা দিচ্ছে অতঃপর এই পৃথিবীকে সংকীর্ণ বলে অপবাদ দেয়ে পরাপারে পাড়ি দিচ্ছে অথচ সে জানে না কেউ হয়ত তার ভালোবাসাকে সম্বল করে আজো বেঁচে আছে

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিদায় অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট (নমুনা)

জনাব মোঃ আশরাফ উদ্দিন, রেক্টর বিপিএটিসি (সরকারের সচিব) , এঁর বিদায় অনুষ্ঠান, তারিখঃ ৩০-মে-২০২৪ ইং, সময়ঃ ১১.০০ ঘটিকা। বিদায় অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্রমধারা   ১) পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত  ২) কর্মচারী ক্লাব এর সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য ৩ ) কর্মচারী ক্লাব এর সভাপতির বক্তব্য ৪ ) জনাব রাজীব কুমার ঢালী, সহকারী পরিচালক এর বক্তব্য ৫) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৬) জনাব শামীম হোসেন, উপপরিচালক এর বক্তব্য ৭) জনাব হাসান মূর্তাজা মাসুম, পরিচালক এর বক্তব্য ৮) বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজের পক্ষ হতে মান পত্র প্রদান ৯) আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের পক্ষ হতে উপ-পরিচালক, আঞ্চলিক লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রাজশাহী এর বক্তব্য ১০) লেডিস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদিকা এর বক্তব্য ১১) জনাব মোঃ আশরাফুজ্জামান, প্রকল্প পরিচালক এর বক্তব্য ১২)  জনাব মোঃ শাহীনূর রহমান, এমডিএস এর বক্তব্য ১৩) জনাব  মোঃ মনিরুল ইসলাম, এমডিএস এর বক্তব্য ১৪) জনাব মোঃ জাকির হোসেন, এমডিএস এর বক্তব্য ১৫) বিদায়ী রেক্টর মহোদয়কে ফুল এবং বিদায়ী উপহার প্রদান  ...

সুবহানাল্লাহঃ পেন্সিল_আর্ট

 

বৈপরীত্য

হয়তো তার মৃত্যুর কথা মনে পড়ে; কারণ, বারেক আলী আবার সেই স্বপ্নটা দেখে,বারবার দেখে;যে স্বপ্নে লম্বা লেজওয়ালা একপাল বুনো কুকুর বা শেয়াল ধস্তাধস্তি করে ছিঁড়ে খায় তার ঝুলে পড়া চামড়ার কোঁচকানো শরীর।সময়ের বিবর্তনে শুকিয়ে আসা চামড়াবহুল শিকার হয়তো তাদের কাছে বিস্বাদ লাগে,ফলে চিবানোর পর গিলতে না পেরে বা দাঁতে না কাটায় ক্ষোভে বিরক্তিতে থুতুর মতো ছুঁড়ে দেয় আকাশের দিকে।কয়েক হাত দূরে গিয়ে সে থ্যাবড়ানো টুকরাগুলো ধূলার সাথে পলট দিয়ে দলা পাকায়।সারল মাংশ না পেয়ে তাদের হিংস্রতা চরমে ওঠে।ভগ্ন-নিথর ও অসহায় দেহটা টানাহেঁচড়া না করে সমর্পিত করে ক্ষুধার্ত হাড্ডিসার মুখগুলোর সামনে। বারেক আলী এ স্বপ্নটা শেষ হলে প্রতিদিনের মতো ভয় পায়,বুকে থুতু ছিঁটিয়ে বিড়বিড় করে---জলপানির ওয়াক্তে দ্যাকা স্বপন ছ্যাঁচা হয়!শব্দকটা শেষ হলে কেমন হাঁপিয়ে ওঠে, দাঁতহীন চোওয়ালের ফাঁক গলে ঘোগলা গড়াতে থাকে;সিথানের নোংরা ত্যানা দিয়ে তা মুছে, এবং নিজেকে চিমটি কেটে জীবিত না মৃত পরখ করার ইচ্ছা জাগে,কিন্তু করেনা;শনের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভোরের অরুণ রাঙা সূর্যের দিকে চেয়ে থাকে নির্লিপ্তভাবে। তবে আজ সে একটি স্বপ্ন বেশি দেখে,যা দেখার পরই সিদ্ধান্...